পূর্ব ভারতের সেরা ১০টি জলপ্রপাতের ভ্রমণ গাইড। কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, আনুমানিক খরচ, ভ্রমণের সেরা সময় ও গুরুত্বপূর্ণ টিপস।

বর্ষার রিমঝিম শব্দ আর মেঘের আনাগোনা মনে করিয়ে দেয়—শহুরে ব্যস্ততা ছেড়ে এবার প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। একজন পেশাদার ট্রাভেল রাইটার হিসেবে বহু বছর ধরে আমি ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত চষে বেড়িয়েছি। তবে বিশ্বাস করুন, বর্ষাকালে এবং বর্ষার ঠিক পরপরই পূর্ব ভারতের (Eastern India) পাহাড়ি অঞ্চল ও জঙ্গলগুলো যে রূপ ধারণ করে, তার কোনো তুলনা হয় না। এই সময়ে এখানকার ঝরনা বা জলপ্রপাতগুলো যেন এক নতুন যৌবন পায়। বুক চিরে নেমে আসা তীব্র জলধারা আর চারপাশের ঘন সবুজ অরণ্য মিলে তৈরি হয় এক অলৌকিক পরিবেশ।
আপনি যদি কলকাতা থেকে মাত্র কয়েক দিনের জন্য একটি দুর্দান্ত উইকএন্ড ট্রিপ বা ছোটখাটো রিফ্রেশিং ট্যুরের প্ল্যান করে থাকেন, তবে পূর্ব ভারতের এই ১০টি জলপ্রপাত আপনার তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত। এই ব্লগে আমি আপনাকে প্রতিটি জলপ্রপাতের খুঁটিনাটি, কলকাতা থেকে যাওয়ার নিখুঁত রুট, থাকার জায়গা এবং আনুমানিক খরচের একটি কমপ্লিট গাইডলাইন দেব।
পূর্ব ভারতের সেরা ১০টি জলপ্রপাত: একটি সম্পূর্ণ গাইড
নিচে একটি কমপ্লিট ওভারভিউ দেওয়া হলো, যা আপনার ভ্রমণের পরিকল্পনাকে আরও সহজ করে তুলবে। বিস্তারিত গাইডলাইনে যাওয়ার আগে চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক আমাদের তালিকায় কী কী থাকছে:
১. হুন্ড্রু জলপ্রপাত (Hundru Falls), ঝাড়খণ্ড

ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচি জেলাকে বলা হয় “ঝরনার শহর” (City of Waterfalls)। আর সেই মুকুটের সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন হলো হুন্ড্রু জলপ্রপাত। সুবর্ণরেখা নদীর জলধারা প্রায় ৩২০ ফুট উচ্চতা থেকে নিচে পাথুরে চাতালের ওপর আছড়ে পড়ে। বর্ষার সময়ে এর গর্জন কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়। বাতাসে ওড়ে জলের সূক্ষ্ম কণা, যা আপনার মুখে এসে লাগলে নিমেষেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: হাওড়া থেকে ট্রেনে চলে যান রাঁচি (যেমন রাঁচি শতাব্দী বা ক্রিয়াযোগ এক্সপ্রেস)। রাঁচি স্টেশন থেকে হুন্ড্রু জলপ্রপাতের দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। স্টেশন বা রাঁচি শহর থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি (Cab) ভাড়া করে সহজেই ঘুরে আসা যায়।
- কোথায় থাকবেন: সবচেয়ে ভালো হয় রাঁচি মেইন টাউনে থাকলে। সেখানে চাণক্য বি এন আর (Chanakya BNR), হোটেল রাধিশন বা বাজেট ফ্রেন্ডলি প্রচুর হোটেল পাবেন।
- আনুমানিক খরচ: কলকাতা থেকে রাঁচি ট্রেন ভাড়া (AC 3 Tier) প্রায় ৭৫০ টাকা। রাঁচি থেকে হুন্ড্রু যাওয়ার জন্য রাউন্ড-ট্রিপ গাড়ি ভাড়া পড়বে ২,৫০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা। রাঁচিতে হোটেল খরচ প্রতি রাত ১,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা।
২. বারেহিপানি জলপ্রপাত (Barehipani Falls), ওড়িশা

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় অবস্থিত সিমলিপাল জাতীয় উদ্যান (Simlipal National Park)-এর গভীর অরণ্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে বারেহিপানি। এটি ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ জলপ্রপাত, যার উচ্চতা প্রায় ১,৩০৮ ফুট (৩৯৯ মিটার)। এটি একটি দ্বি-স্তর বিশিষ্ট (Two-tier) জলপ্রপাত। মেঘাসনি পাহাড় থেকে নেমে আসা বুধাবলঙ্গ নদীর জলধারা যখন ঘন শাল ও মহুয়া বনের মাঝখান দিয়ে নিচে আছড়ে পড়ে, সেই দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব। বর্ষার ঠিক পর (অক্টোবর-নভেম্বর) যখন জঙ্গল খোলে, তখন এর সৌন্দর্য দেখার মতো হয়।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: কলকাতা থেকে ট্রেনে বা বাসে প্রথমে চলে আসুন বারিপদা (Baripada) অথবা বালেশ্বর (Balasore)। বারিপদা থেকে সিমলিপালের এন্ট্রি পয়েন্ট পীতাবাঁটা (Pithabata) বা যশিপুর (Jashipur) হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করতে হয়। বারেহিপানি দেখতে হলে আপনাকে ফরেস্ট পারমিট নিয়ে ভেতরে যেতে হবে।
- কোথায় থাকবেন: ওড়িশা ট্যুরিজমের (OTDC) তোশালি রয়্যাল রিসোর্ট (Simlipal) অথবা জঙ্গলের ভেতরে অবস্থিত নেচার ক্যাম্পগুলোতে (যেমন কুমারী বা বারেহিপানি নেচার ক্যাম্প) থাকতে পারেন। বুকিং ওড়িশা ইকো-ট্যুরিজমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে করতে হয়।
- আনুমানিক খরচ: ট্রেন বা বাস ভাড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। জঙ্গল সাফারির জন্য বোলেরো বা স্করপিও গাড়ি ভাড়া নিতে হয়, যা প্রতিদিনের জন্য ৪,৫০০ থেকে ৫,৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে (গাইড ও এন্ট্রি ফি সহ)। ইকো-ক্যাম্পে থাকা-খাওয়া প্রতি রাত ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা (ডাবল বেড)।
৩. দশম জলপ্রপাত (Dassam Falls), ঝাড়খণ্ড

রাঁচি থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে কাঞ্চি নদীর ওপর তৈরি হয়েছে এই অসাধারণ দশম জলপ্রপাতটি। প্রায় ১৪৪ ফুট উচ্চতা থেকে ১০টি বিভিন্ন ধারায় জল নিচে পড়ে বলে এর নাম ‘দশম’। বর্ষাকালে এই ১০টি ধারা মিলেমিশে একাকার হয়ে একটি রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। এখানকার পাথুরে ল্যান্ডস্কেপ এবং চারপাশের জঙ্গল ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গরাজ্য। তবে মনে রাখবেন, বর্ষায় এখানকার জলের টান অত্যন্ত বেশি থাকে, তাই নিচে নেমে স্নান করার চেষ্টা একেবারেই করবেন না।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: রাঁচি স্টেশন বা বিমানবন্দর থেকে সোজা টাটা-রাঁচি হাইওয়ে (NH-33) ধরে গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া যায় দশম ফলস। সময় লাগে মাত্র ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা।
- কোথায় থাকবেন: রাঁচি শহরে থাকাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। ঝাড়খণ্ড পর্যটনের একটি ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্সও রয়েছে জলপ্রপাতের কাছাকাছি, তবে সেখানে থাকার চেয়ে ডে-ট্রিপ করাই শ্রেয়।
- আনুমানিক খরচ: রাঁচি থেকে দশম ফলসের গাড়ি ভাড়া ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা। খাবার ও এন্ট্রি ফি নামমাত্র।
আরও পড়ুন :- ভারতের সেরা ৭টি পরিবার-বান্ধব অ্যাডভেঞ্চার গন্তব্য, তথ্য সহ
৪. চেঙ্গে জলপ্রপাত (Changey Falls), পশ্চিমবঙ্গ
উত্তরবঙ্গের কালিম্পং জেলার লাভা (Lava) থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চেঙ্গে জলপ্রপাত। পাহাড়ের কোল বেয়ে প্রায় ৩০০ ফুট ওপর থেকে সাদা দুধের মতো ফেনা তুলে জলরাশি নিচে আছড়ে পড়ছে। চারপাশের পাইন আর ফার্নের জঙ্গল, সাথে নির্জন পাহাড়ি পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম সেরা অফবিট জলপ্রপাত। বর্ষার সময়ে পাহাড়ি নদীগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে বলে চেঙ্গের রূপ এই সময়ে সবচেয়ে মায়াবী দেখায়।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) চলে যান। সেখান থেকে কালিম্পং বা লাভাগামী গাড়ি ভাড়া করে নিন। লাভা থেকে আলাদা স্থানীয় গাড়ি নিয়ে চেঙ্গে ফলস যেতে হয়, কারণ রাস্তাটি বেশ খাড়া এবং পাহাড়ি।
- কোথায় থাকবেন: লাভা বা কোলাখাম (Kolakham)-এর যেকোনো হোমস্টে বা ডব্লিউবিএফডিসি (WBFDC) রিসোর্টে থাকতে পারেন। কোলাখামের হোমস্টে থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশাপাশি চেঙ্গে জলপ্রপাতের মৃদু শব্দও উপভোগ করা যায়।
- আনুমানিক খরচ: এনজেপি থেকে লাভা বা কোলাখাম গাড়ি ভাড়া ৩,৫০০ থেকে ৪,৫– টাকা। লাভা থেকে চেঙ্গে যাওয়ার লোকাল গাড়ি ভাড়া ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকা। হোমস্টেতে থাকা-খাওয়া প্রতি জন প্রতি দিন ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকা।
৫. জোনহা জলপ্রপাত (Jonha Falls), ঝাড়খণ্ড

গৌতমধারা নামেও পরিচিত এই জোনহা জলপ্রপাতটি রাঁচি-পুরুলিয়া রোডের কাছে রাড়ু নদীর ওপর অবস্থিত। লোকগাথা অনুযায়ী, ভগবান বুদ্ধ এই জলপ্রপাতের পবিত্র জলে স্নান করেছিলেন, তাই এর অপর নাম গৌতমধারা। পাহাড়ের গা বেয়ে প্রায় ১৪৫ ফুট নিচে নেমে গেছে এর জলধারা। মূল ঝরনার কাছে পৌঁছাতে হলে আপনাকে প্রায় ৪৫০টিরও বেশি সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে হবে। চারপাশের শাল ও পিয়াল বনের ছায়া আর পাখির ডাক আপনার মন ভালো করে দেবেই।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: হাওড়া থেকে ট্রেনে রাঁচি বা পুরুলিয়া হয়ে যাওয়া যায়। সড়কপথে যেতে চাইলে কলকাতা থেকে বাসে বা গাড়িতে সোজা পুরুলিয়া হয়ে জোনহা পৌঁছানো সম্ভব (দূরত্ব প্রায় ৩৪০ কিমি)। রাঁচি শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪০ কিমি।
- কোথায় থাকবেন: রাঁচি শহরের হোটেল অথবা জোনহার কাছেই অবস্থিত ঝাড়খণ্ড পর্যটনের ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউসে থাকতে পারেন।
- আনুমানিক খরচ: রাঁচি থেকে সাইটসিয়িং গাড়িতে হুন্ড্রু এবং জোনহা একসাথে কভার করলে ৩,৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে যায়। ট্রিপের মোট বাজেট প্রতি ব্যক্তি ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব (২ দিনের জন্য)।
৬. খণ্ডধার জলপ্রপাত (Khandadhar Falls), ওড়িশা

ওড়িশার সুন্দরগড় জেলায় অবস্থিত খণ্ডধার জলপ্রপাতটি পূর্ব ভারতের অন্যতম সুউচ্চ এবং সুন্দর জলপ্রপাত। প্রায় ৮– ফুট (২৪৪ মিটার) উচ্চতা থেকে একটি সোজা খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে জল নিচে পড়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে কেউ একটি চকচকে তলোয়ার ঝুলিয়ে রেখেছে (ওড়িয়া ভাষায় ‘খণ্ড’ মানে তলোয়ার)। বর্ষাকালে যখন এই ঝরনায় জলের পরিমাণ বাড়ে, তখন এর চারপাশের কুয়াশার মতো জলকণা পুরো উপত্যকাকে ঢেকে দেয়।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: কলকাতা থেকে ট্রেনে চলে যান রাউরকেল্লা (Rourkela)। রাউরকেল্লা স্টেশন থেকে খণ্ডধারের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। সেখান থেকে প্রাইভেট ট্যাক্সি বা লোকাল বাসে করে পৌঁছানো যায়।
- কোথায় থাকবেন: রাউরকেল্লা শহরে সমস্ত বাজেটের ভালো হোটেল পেয়ে যাবেন। এছাড়া জলপ্রপাতের কাছে ওড়িশা পর্যটনের ইকো-কটেজও রয়েছে।
- আনুমানিক খরচ: হাওড়া থেকে রাউরকেল্লা এক্সপ্রেস ট্রেনের এসি থ্রি-টিয়ার ভাড়া প্রায় ৭০০ টাকা। রাউরকেল্লা থেকে গাড়ি ভাড়া গাড়িভেদে ২,৫০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা।
আরও পড়ুন :- বর্ষার পূর্ব ভারতে উৎসবের রঙে ভেজা এক অনন্য যাত্রা
৭. জোলান্দা বা জোরান্দা জলপ্রপাত (Joranda Falls), ওড়িশা

বারেহিপানির ঠিক কাছাকাছি, সিমলিপাল জাতীয় উদ্যানের ভেতরেই অবস্থিত জোরান্দা জলপ্রপাত। এটি প্রায় ৪৯২ ফুট (১৫০ মিটার) উঁচু। বারেহিপানির মতো এটি ধাপে ধাপে নামেনি, বরং একটি একক ধারা হিসেবে খাড়া পাহাড় থেকে সোজা নিচে নেমে গেছে। চারপাশের কালো পাথর আর তার ওপর আছড়ে পড়া ধবধবে সাদা জলের বৈপরীত্য এক অদ্ভুত আদিম সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: বারেহিপানি জলপ্রপাতের রুট আর জোরান্দার রুট একই। সিমলিপাল ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে জিপ সাফারির অংশ হিসেবেই এই দুটি ঝরনা একসাথে দেখানো হয়।
- কোথায় থাকবেন: যশিপুর বা বারিপদার হোটেল অথবা সিমলিপাল ইকো-ট্যুরিজম রিসোর্ট।
- আনুমানিক খরচ: বারেহিপানি ট্রিপের খরচের মধ্যেই জোরান্দা কভার হয়ে যায়, আলাদা কোনো গাড়ি ভাড়ার প্রয়োজন নেই।
৮. রেইনবো জলপ্রপাত (Rainbow Falls), পশ্চিমবঙ্গ
উত্তরবঙ্গের কার্সিয়াং (Kurseong) মহকুমার বাগোরা এবং টুডু জিঙের কাছাকাছি লুকিয়ে আছে এক রত্ন—রেইনবো ফলস। এর আসল নাম অবশ্য ‘হুইশলিং ক্যাসকেড’, তবে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে দুপুরের দিকে জলের ওপর সূর্যের আলো পড়ে এখানে প্রায়শই রামধনু বা রেইনবো তৈরি হয় বলে স্থানীয়রা একে রেইনবো ফলস বলেন। ট্রেকিংপ্রেমীদের জন্য এটি একটি আদর্শ জায়গা। ঘন ডুয়ার্সের জঙ্গল আর চা বাগানের বুক চিরে পাহাড়ি পথ বেয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়। বর্ষার শেষে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এখানে রামধনু দেখার সুযোগ সবচেয়ে বেশি থাকে।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে এনজেপি বা বিমানে বাগডোগরা। সেখান থেকে কার্সিয়াংগামী গাড়ি ধরুন। কার্সিয়াং থেকে ডাউহিল রোড হয়ে বাগোরা বা টুডু ভিলেজ পৌঁছান। সেখান থেকে কিছুটা পথ হেঁটে বা ট্রেকিং করে ঝরনার মুখে পৌঁছাতে হয়।
- কোথায় থাকবেন: কার্সিয়াং শহরের কোনো হেরিটেজ হোটেল অথবা বাগোরা বা সিটং (Sittong)-এর কোনো সুন্দর পাহাড়ি হোমস্টেতে।
- আনুমানিক খরচ: এনজেপি থেকে কার্সিয়াং গাড়ি ভাড়া ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা। হোমস্টেতে থাকা ও ৩ বেলার খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি ১,৫০০ টাকা প্রতিদিন।
৯. সনা ঘাগরা এবং বড় ঘাগরা (Sana Ghagara & Bada Ghagara), ওড়িশা

ওড়িশার কেওনঝড় (Keonjhar) জেলায় মাত্র ৩ কিলোমিটারের ব্যবধানে এই দুটি সুন্দর জলপ্রপাত অবস্থিত। সনা ঘাগরা মাত্র ৩০ ফুট উঁচু হলেও এর চারপাশের সুসজ্জিত পার্ক এবং শান্ত পরিবেশ পিকনিকের জন্য দারুণ। অন্যদিকে, বড় ঘাগরা প্রায় ১০০ ফুট উঁচু এবং এটি একটি ঘন বনের মধ্যে অবস্থিত। মাছকান্দনা নদীর ওপর তৈরি এই দুটি জলপ্রপাতই বর্ষাকালে কানায় কানায় পূর্ণ থাকে এবং কলকাতা থেকে খুব সহজেই ৩ দিনের একটি ছোট ট্যুরে ঘুরে আসা যায়।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: কলকাতা থেকে খড়গপুর-যশিপুর হয়ে সড়কপথে কেওনঝড় যাওয়া যায় (দূরত্ব প্রায় ৩৩০ কিমি)। ট্রেনে যেতে চাইলে শালিমার থেকে সেকান্দারবাদ বা ভুবনেশ্বরগামী ট্রেনে কটক বা হরিচন্দনপুর হয়ে যাওয়া যায়, তবে সড়কপথে সরাসরি গাড়ি বা লাক্সারি বাস নেওয়াই সবচেয়ে আরামদায়ক।
- কোথায় থাকবেন: কেওনঝড় মেইন টাউনে ওড়িশা পর্যটনের পান্থনিবাস (Panthanivas) বা বেশ কিছু ভালো প্রাইভেট হোটেল আছে।
- আনুমানিক খরচ: কলকাতা থেকে বাসের টিকিট ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। কেওনঝড় টাউন থেকে লোকাল অটো বা গাড়ি নিয়ে এই দুটি ঝরনা ঘুরতে খরচ হবে ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা।
১০. লোধ জলপ্রপাত (Lodh Falls), ঝাড়খণ্ড

আমাদের তালিকার শেষ কিন্তু অন্যতম সেরা আকর্ষণ হলো লোধ জলপ্রপাত, যা বুড়া ঘাগ (Burha Ghagh) নামেও পরিচিত। এটি ঝাড়খণ্ডের পালামৌ ডিভিশনের লাতেহার (Latehar) জেলায় অবস্থিত এবং এটিই ঝাড়খণ্ডের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত (উচ্চতা প্রায় ৪৬৮ ফুট)। বুড়া নদীর জল যখন পাহাড়ের গা বেয়ে প্রচণ্ড গতিতে নিচে নামে, তখন তৈরি হওয়া গর্জন অনেক দূর থেকে শোনা যায়। নকশাল অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় আগে এখানে পর্যটকদের যাতায়াত কম ছিল, তবে বর্তমানে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ঝাড়খণ্ড পর্যটন একে খুব সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছে।
- কলকাতা থেকে যাওয়ার উপায়: হাওড়া থেকে ট্রেনে চলে যান ডাল্টনগঞ্জ (Daltonganj) বা রাঁচি। রাঁচি থেকে নেতরহাট (Netarhat) হয়ে লোধ ফলস যাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট। রাঁচি থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৯৫ কিমি এবং নেতরহাট থেকে মাত্র ৬০ কিমি।
- কোথায় থাকবেন: সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা হবে যদি আপনি নেতরহাটের পাহাড়ি রানি (Chalet House বা ঝাড়খণ্ড পর্যটনের হোটেল) অথবা মহুয়াডাঁড় (Mahuadanr)-এর গেস্ট হাউসে থাকেন।
- আনুমানিক খরচ: রাঁচি থেকে লোধ-নেতরহাট-বেতলা জঙ্গল মিলিয়ে ৩ দিনের গাড়ি ভাড়া পড়বে ৯,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা (ইনোভা বা স্করপিও)। হোটেল খরচ প্রতি রাত ১,৫০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা।
রুট, খরচ ও থাকার জায়গার তুলনামূলক ছক
আপনার সুবিধার জন্য কলকাতা থেকে এই ৩টি প্রধান জোনের (ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও উত্তরবঙ্গ) একটি সংক্ষিপ্ত লজিস্টিকস চার্ট নিচে দেওয়া হলো:
| জোন / অঞ্চল | কলকাতা থেকে প্রধান ট্রাভেল হাব | সেরা থাকার অপশন | ৩ দিনের ট্যুরের আনুমানিক বাজেট (প্রতি ব্যক্তি) |
|---|---|---|---|
| রাঁচি সার্কিট (হুন্ড্রু, দশম, জোনহা) | রাঁচি রেলওয়ে স্টেশন / বিমানবন্দর | রাঁচি শহরের হোটেল বা ঝাড়খণ্ড পর্যটনের রিসোর্ট | ₹৫,০০০ – ₹৭,০০০ (গ্রুপে ভ্রমণ করলে কমবে) |
| সিমলিপাল ও কেওনঝড় (বারেহিপানি, জোরান্দা, ঘাগরা) | বারিপদা / বালেশ্বর / রাউরকেল্লা | ওড়িশা ইকো-ট্যুরিজম ক্যাম্প ও OTDC পান্থনিবাস | ₹৬,৫০০ – ₹৯,০০০ (ফরেস্ট পারমিট সহ) |
| উত্তরবঙ্গ পাহাড় (চেঙ্গে, রেইনবো ফলস) | নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) / শিয়ালদহ | লাভা, কোলাখাম বা কার্সিয়াং-এর হোমস্টে | ₹৭,০০০ – ₹১০,০০০ (পাহাড়ি গাড়ি ভাড়ার জন্য) |
বর্ষার ট্রাভেল টিপস: সিনিয়র রাইটারের কিছু জরুরি পরামর্শ
পাহাড়ি বা জঙ্গল এলাকার জলপ্রপাতে বর্ষার সময়ে যাওয়ার আগে একজন অভিজ্ঞ ট্রাভেলার হিসেবে আমি আপনাকে কিছু সতর্কতা মেনে চলার অনুরোধ করব:
- পাথরে পা ফেলার সতর্কতা: বর্ষাকালে জলপ্রপাতের চারপাশের পাথরগুলোতে শ্যাওলা জমে অত্যন্ত পিছল হয়ে থাকে। তাই ভালো গ্রিপযুক্ত ট্রেকিং জুতো বা স্নিকার্স ব্যবহার করুন।
- জলের গভীরে নামবেন না: বর্ষার সময়ে হড়পা বান (Flash Flood) বা পাহাড়ি নদীর জলের তোড় হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। কোনো অবস্থাতেই সুরক্ষারেখা পেরিয়ে জলের নিচে যাবেন না।
- পোকামাকড় ও জোঁকের উপদ্রব: বিশেষ করে সিমলিপাল বা উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে এই সময়ে প্রচুর জোঁক (Leeches) থাকে। সঙ্গে সবসময় নুন বা ডেটল স্প্রে রাখবেন।
- অগ্রিম বুকিং: বর্ষার ঠিক পর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বাঙালির পুজো বা উৎসবের মরশুম শুরু হয়ে যায়, তাই ট্রেন ও ফরেস্ট রিসোর্টগুলো অন্তত ২-৩ মাস আগে বুক করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
তাহলে আর দেরি কেন? ব্যাগ গুছিয়ে নিন, ট্রেনের টিকিট কাটুন আর প্রকৃতির এই অপরূপ জলধারার সাক্ষী হতে বেরিয়ে পড়ুন। শুভ যাত্রা!

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷
