কেঞ্জাকুড়া মা সঞ্জীবনী মুড়ি মেলা, বাঁকুড়ার এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম কেঞ্জাকুড়ার পাশ দিয়ে যাওয়া দ্বারকেশ্বর নদীর শুষ্ক বালুচরে ফিবছর উদযাপিত হয় এই লোকউৎসব।
পর্যটনের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কোনো উৎসব একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের দর্পণ হয়ে ওঠে, তখন তা আর কেবল দেখার বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক পরম অনুভূতি। পশ্চিমবঙ্গের লালমাটির জেলা বাঁকুড়ার সদর থানা এলাকার অন্তর্গত একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম কেঞ্জাকুড়া। এই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রাঢ় বাংলার অন্যতম প্রধান নদী দ্বারকেশ্বর। আর এই নদীর শুষ্ক বালুচরেই প্রতি বছর উদযাপিত হয় এক অভূতপূর্ব লোকউৎসব—কেঞ্জাকুড়া মা সঞ্জীবনী মুড়ি মেলা।
বাঙালি সংস্কৃতিতে মেলার অবদান অনস্বীকার্য, তবে কেবল মুড়িকে কেন্দ্র করে লক্ষাধিক মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত বোধহয় পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। পর্যটন মানচিত্রের চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে থাকা এই মেলা আসলে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজের এক গভীর সামাজিক সংহতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।
ভৌগোলিক অবস্থান ও লোকসংস্কৃতির আঙিনা
কেঞ্জাকুড়া গ্রামটি ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বাঁকুড়া জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১৬-১৭ কিলোমিটারের কাছাকাছি। এর নিকটবর্তী রেলস্টেশন হলো ছাতনা। গ্রামটির তিন দিক ঘিরে রেখেছে দ্বারকেশ্বর নদ। রাঢ় অঞ্চলের রুক্ষ লালমাটি, শাল-পলাশের জঙ্গল আর পলি-পড়া নদীর চরের এই প্রাকৃতিক মেলবন্ধন কেঞ্জাকুড়াকে এক নিজস্ব চরিত্র দান করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রা এবং খাদ্যাভ্যাসও আবর্তিত হয়। পৌষের শীত পেরিয়ে মাঘের শুরুতে যখন রাঢ় বাংলায় ঠান্ডা হাওয়া বইতে থাকে, ঠিক তখনই এই মেলার আসর বসে। প্রতি বছর বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৪ঠা মাঘ দ্বারকেশ্বর নদের সঞ্জীবনী ঘাটে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
কেঞ্জাকুড়া মা সঞ্জীবনী মুড়ি মেলা: ইতিহাস ও লোকশ্রুতি (Historical & Mythological Roots)

কেঞ্জাকুড়ার মুড়ি মেলার ইতিহাস কত বছরের পুরনো, তা সুনির্দিষ্টভাবে নথিবদ্ধ নেই; তবে স্থানীয় প্রবীণদের মতে এটি শতাব্দী প্রাচীন এক ঐতিহ্য। এই উৎসবের সূচনার পেছনে রয়েছে এক চমৎকার লোকগাথা ও ধর্মীয় বিশ্বাস。
দ্বারকেশ্বর নদের তীরে অবস্থিত ‘মা সঞ্জীবনী’র আশ্রম বা মন্দিরকে কেন্দ্র করেই এই মেলার উৎপত্তি। কথিত আছে, প্রাচীনকালে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম ছিল এবং চারপাশ ঘন জঙ্গল ও শ্বাপদসংকূল ছিল, তখন দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা মা সঞ্জীবনী মন্দিরে আসতেন হরিনাম সংকীর্তন শুনতে এবং দেবীর পুজো দিতে। মাঘ মাসের শুরুতে এখানে চার দিন ধরে অখণ্ড নামসংকীর্তন চলত।
ঐতিহাসিক লোকশ্রুতি: দূর থেকে আসা সেইসব পুণ্যার্থীরা রাতে আর বাড়ি ফিরতে পারতেন না। শীতের রাতে আশ্রমে কাটিয়ে পরদিন সকালে বাড়ি ফেরার আগে তাঁরা নিজেদের সাথে আনা শুকনো খাবার অর্থাৎ ‘মুড়ি’ দ্বারকেশ্বর নদের পবিত্র জলে ভিজিয়ে খেতেন। জঙ্গলমহলের এই রুক্ষ অঞ্চলে মুড়িই ছিল সবচেয়ে সহজলভ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য। যুগের সাথে সাথে সেই ভক্তদের সকালের যূথবদ্ধ প্রাতরাশই আজ এক বিশাল মেলায় রূপ নিয়েছে।
আরও পড়ুন :- পশ্চিমবঙ্গে 15টি জনপ্রিয় মেলা ও প্রদর্শনী কোথায়, কবে হয়
মুড়ি: রাঢ় বাংলার আর্থ-সামাজিক সংস্কৃতির প্রতীক
কাছাকাছি কোনো শহুরে মানুষের কাছে মুড়ি হয়তো কেবলই একটা সাধারণ জলখাবার বা বিকেলের টিফিন। কিন্তু বাঁকুড়া, পুরুলিয়া বা মেদিনীপুরের মানুষের কাছে মুড়ি এক আবেগের নাম। মুড়িকে বাদ দিয়ে রাঢ় অঞ্চলের মানুষের জীবন ভাবাই যায় না। এই অঞ্চলের কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের শক্তির অন্যতম উৎস হলো এই মুড়ি।
কেঞ্জাকুড়ার এই মেলায় মুড়ি কোনো সাধারণ খাদ্য হিসেবে উপস্থিত থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক উৎসবের প্রধান উপাদান। মেলায় মানুষ ঘর থেকে বস্তা বস্তা মুড়ি নিয়ে আসেন। দ্বারকেশ্বর নদের চরে গামছা পেতে সেই মুড়ি ঢালা হয়। আর তার সাথে মেশানো হয় হরেক রকমের অনুষঙ্গ:
- ঘরের তৈরি খাঁটি সরষের তেল
- কাঁচা লঙ্কা, পেঁয়াজ ও কুচানো টমেটো
- শীতকালীন মটরশুঁটি ও শসা
- মেলার মাঠের গরম গরম চপ, বেগুনি ও সিঙ্গাড়া
- কোনো কোনো পরিবার আবার বাড়ি থেকে বানিয়ে আনে চানাচুর বা ঘুগনি
নদীর কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায়, বালির ওপর বসে হাজার হাজার মানুষ যখন একসাথে এই মুড়ি মাখা ভাগ করে খান, তখন সেখানে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না。 এটি কেবল খাওয়া নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক উৎসব, যা বাংলার আদিম যৌথ সংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
জাতপাতহীন মেলবন্ধন: সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ
পশ্চিমবঙ্গের লোকউৎসবগুলির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের অসাম্প্রদায়িক ও শ্রেণীহীন চরিত্র। কেঞ্জাকুড়ার মুড়ি মেলা এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক যুগে যখন মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে, তখন এই মেলা বিপরীত এক ছবি দেখায়।
নদীর চরে যখন গামছা বা মাদুর পেতে মানুষ বসে, তখন সেখানে কোনো জাতপাতের বিচার থাকে না, থাকে না কোনো ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ। পাশের বাড়ির চেনা প্রতিবেশী থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ অচেনা কোনো আগন্তুক—সবাই একই চরে পাশাপাশি বসে মুড়ির পাত্রে হাত বাড়ায়। মেলা কমিটির পক্ষ থেকে মা সঞ্জীবনী সমিতির উদ্যোগে বিশাল আকারে খিচুড়ি প্রসাদেরও আয়োজন করা হয়, যেখানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে বসে প্রসাদ গ্রহণ করেন。
কলকাতায় কর্মরত বাঁকুড়ার বাসিন্দা বিল্বমঙ্গল পাত্রের ভাষায়, “কাজের সূত্রে বছরের বেশিরভাগ সময় বাইরে কাটাতে হলেও, এই দিনটায় বাড়ি ফিরতেই হয়। দ্বারকেশ্বরের চরে সবার সাথে বসে মুড়ি খাওয়ার এই যে আনন্দ, এর কোনো বিকল্প আধুনিক শহরের বিলাসবহুল রেস্তোরাঁতেও নেই।” এই মেলা প্রবাসী গ্রামীণ যুবকদের শিকড়ে ফেরার এক অমোঘ টান।
কেঞ্জাকুড়ার অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও কুটিরশিল্প ঐতিহ্য
কেবল মুড়ি মেলাই নয়, কেঞ্জাকুড়া গ্রামটির নিজস্ব একটি সমৃদ্ধ শিল্প-ইতিহাস রয়েছে, যা বাংলার ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। এই মেলা দেখতে এলে এই অঞ্চলের প্রাচীন কুটিরশিল্পের সাথেও পরিচিত হওয়া যায়:
১. কাঁসা ও পিতল শিল্প (Bell Metal Craft)
কেঞ্জাকুড়া এক সময় কাঁসা ও পিতলের বাসনের জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত ছিল। এখানকার শিল্পীদের হাতের কাজ জগতজোড়া। গ্রামের একটি বড় অংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকায় তাঁরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে শিল্পী দেবতা বিশ্বকর্মার পুজো করে থাকেন। মেলার সময় এই সব ঐতিহ্যবাহী বাসনের কেনাবেচাও চোখে পড়ে।
২. তাঁত শিল্প (Weaving Heritage)
যদিও আধুনিক যন্ত্রশিল্পের চাপে কেঞ্জাকুড়ার ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প আগের চেয়ে কিছুটা স্তিমিত, তবুও একসময় এখানকার ঘরে ঘরে তাঁতের খটখট শব্দ শোনা যেত। মেলার দিনগুলিতে গ্রামীণ কারিগররা তাঁদের বুনে তোলা সুতির বস্ত্র প্রদর্শন ও বিক্রি করেন।
৩. জায়ান্ট জিলিপি (Giant Jalebi)
এই অঞ্চলের আরেকটি অদ্ভুত আকর্ষণ হলো বিশাল আকারের জিলিপি। সাধারণ জিলিপির চেয়ে আকারে অনেক বড়, এক একটির ওজন প্রায় ১ থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত হতে পারে! মেলা প্রাঙ্গণে এই দানবীয় জিলিপি ভাজার দৃশ্য পর্যটকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য গাইডলাইন (Traveler’s Guide)
যদি আপনি এই অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে চান, তবে আপনার সুবিধার্থে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
কখন যাবেন?
প্রতি বছর বাংলা ক্যালেন্ডারের ৪ঠা মাঘ (সাধারণত ইংরেজি জানুয়ারি মাসের ১৭ থেকে ১৯ তারিখের মধ্যে) এই মেলা মূল রূপ ধারণ করে। শীতের আমেজে এই গ্রামীণ পরিবেশ উপভোগ করার এটাই সেরা সময়।
কীভাবে পৌঁছাবেন?
- রেলপথে: হাওড়া বা সাঁতরাগাছি থেকে ট্রেনে বাঁকুড়া স্টেশন অথবা ছাতনা স্টেশনে নামতে হবে। ছাতনা বা বাঁকুড়া থেকে লোকাল বাস, অটো বা গাড়ি ভাড়া করে সহজেই কেঞ্জাকুড়া পৌঁছানো যায়।
- সড়কপথে: কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে বাঁকুড়া শহরের দূরত্ব প্রায় ২১০ কিমি। বাঁকুড়া শহর থেকে পুরুলিয়া রোড ধরে কিছুটা গিয়ে কেঞ্জাকুড়ার রাস্তা পাওয়া যায়।
শেষ কথা: ঐতিহ্য রক্ষার আহ্বান
কেঞ্জাকুড়া মা সঞ্জীবনী মুড়ি মেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলার প্রকৃত আত্মা লুকিয়ে রয়েছে তার গ্রামগুলিতে, তার সাধারণ মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রার মধ্যে। এটি কেবল মুড়ি খাওয়ার মেলা নয়; এটি আসলে মানুষের সাথে মানুষের, প্রকৃতির সাথে সংস্কৃতির এবং ইতিহাসের সাথে বর্তমানের এক অবিচ্ছেদ্য সেতু।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও প্রযুক্তি-নির্ভর বিশ্বে এই ধরনের লোকউৎসব সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে অতি সাধারণ একটি উপাদানকে কেন্দ্র করেও আনন্দ ও সম্প্রীতির এক বিশাল আকাশ তৈরি করা যায়। পশ্চিমবঙ্গের এই অমূল্য সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ঐতিহ্যকে সচক্ষে দেখতে এবং অনুভব করতে জীবনের যেকোনো একটি শীতকালে আপনাকে কেঞ্জাকুড়ার দ্বারকেশ্বর নদের চরে আসতেই হবে।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷
