বর্ষায় চেরাপুঞ্জি-শিলং ভ্রমণের সম্পূর্ণ বাংলা গাইড। কলকাতা থেকে যাওয়ার রুট, হোটেল, খরচের হিসাব ও জুলাই-অগাস্টের বিশেষ টিপস সহ।

মেঘের ডাক উপেক্ষা করবেন কীভাবে?
বর্ষার প্রথম ধারায় যখন কলকাতার আকাশ ভারী হয়ে আসে, তখন মনে হয় কোথাও একটা পালিয়ে যাই — এমন কোনো জায়গায় যেখানে বৃষ্টি শুধু বিরক্তি নয়, বরং একটা মহাকাব্যিক অভিজ্ঞতা। সেই জায়গার নাম চেরাপুঞ্জি আর শিলং — মেঘালয়ের দুই মুকুটমণি, যাদের জুলাই-অগাস্টে দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা সত্যিই অন্যরকম সুন্দর হতে পারে।
চেরাপুঞ্জি — স্থানীয়ভাবে যার আধিকারিক নাম সোহরা (Sohra) — পৃথিবীর অন্যতম আর্দ্রতম স্থান। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১১,৭৭৭ মিলিমিটার, আর জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেই বৃষ্টির সিংহভাগ আছড়ে পড়ে। এই সময়ে নোহকালিকাই জলপ্রপাত তার পুরো শক্তিতে গর্জন করে, সেভেন সিস্টার্স ফলসের সাতটি ধারা একসঙ্গে ঝরে পড়ে, আর পুরো পাহাড় ঢেকে যায় এক অলীক সবুজে।
আর শিলং? “প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড” খ্যাত এই শহরে বর্ষায় আসে এক অপূর্ব যৌবন। পাইন বনের ভেতর দিয়ে ঝরে পড়া মেঘ, ওয়ার্ডস লেকের পাড়ে বৃষ্টির শব্দ, পুলিশ বাজারের কোনো ক্যাফেতে বসে গরম কফির পেয়ালা হাতে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখা — এই অনুভূতি বর্ষার শিলং ছাড়া পাওয়া যায় না।
এই পোস্টে আমি আপনাকে নিয়ে যাব — কলকাতা থেকে রওনা হওয়া থেকে শুরু করে ফিরে আসা পর্যন্ত। কোন পথে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী দেখবেন, কত খরচ হবে — সব বিস্তারিত জানবেন এখানে। চলুন শুরু করি।
কেন জুলাই-অগাস্টেই চেরাপুঞ্জি? শীতে গেলে হয় না?
অনেকে বলেন, বর্ষায় পাহাড়ে যাওয়া বিপজ্জনক। চেরাপুঞ্জির ক্ষেত্রে সেই কথাটা একটু অন্যভাবে ভাবুন। শীতে বা গ্রীষ্মে চেরাপুঞ্জিতে গেলে দেখবেন — জলপ্রপাতগুলো অনেকটাই নিস্তেজ, পাহাড়ের গা শুষ্ক, আর মেঘের সেই নাটকীয় উপস্থিতি নেই। চেরাপুঞ্জির আসল আত্মা ফোটে বর্ষায়। তাই চেরাপুঞ্জি ভ্রমণ জুলাই অগাস্ট মাসেই সেরা। এই সময়ে যা পাবেন:
- নোহকালিকাই জলপ্রপাত (ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত, প্রায় ৩৪০ মিটার) তার পুরো প্রবল রূপে প্রবাহিত হয় — নীচের নীল-সবুজ লেকের দিকে ভেঙে পড়া জলের দৃশ্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
- সেভেন সিস্টার্স ফলস (নোহসনগিথিয়াং ফলস) — একমাত্র বর্ষাতেই সাতটি আলাদা জলধারা পাশাপাশি দৃশ্যমান হয়। শুষ্ক মৌসুমে এগুলো প্রায় দেখাই যায় না।
- পুরো মেঘালয় অবিশ্বাস্য সবুজ হয়ে ওঠে।
- মেঘ আক্ষরিক অর্থেই রাস্তার মধ্যে নেমে আসে — গাড়ি চালাতে চালাতে মেঘের ভেতরে ঢুকে পড়বেন।
- লিভিং রুট ব্রিজের চারপাশ তরতাজা জঙ্গলে ভরপুর থাকে।
একটু সতর্কতার কথা: বর্ষায় পথ পিচ্ছিল থাকে, মাঝেমাঝে ছোট ধস হতে পারে। তাই ট্রেকিং করার সময় ভালো গ্রিপের জুতো পরুন, স্থানীয় গাইড নিন, এবং আবহাওয়ার খবর রাখুন।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন
চেরাপুঞ্জি ও শিলং পৌঁছানোর প্রধান প্রবেশদ্বার হল গুয়াহাটি। কলকাতা থেকে গুয়াহাটি, সেখান থেকে শিলং, এরপর চেরাপুঞ্জি — এটাই সবচেয়ে সহজ ও প্রচলিত পথ।
✈️ বিমানে — সবচেয়ে দ্রুত পথ
কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (CCU) থেকে গুয়াহাটির লোকপ্রিয় গোপীনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (GAU) পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইট পাওয়া যায়।
- উড়ানের সময়: মাত্র ১ ঘণ্টা
- ভাড়া (আনুমানিক, এক দিকে): ₹২,৫০০ – ₹৬,০০০ প্রতি জন (কত আগে বুক করছেন তার উপর নির্ভর করে)
- বিমান সংস্থা: ইন্ডিগো, এয়ার ইন্ডিয়া, আকাসা এয়ার, স্পাইসজেট
💡 টিপ: ১৫-২০ দিন আগে বুক করলে সবচেয়ে ভালো দাম পাওয়া যায়।
গুয়াহাটি বিমানবন্দর থেকে শিলং: দূরত্ব প্রায় ১০০ কিমি, সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।
- শেয়ার্ড ট্যাক্সি (পল্টন বাজার থেকে): প্রতি জন ₹২০০–₹২৫০
- প্রাইভেট ক্যাব: ₹১,৮০০–₹২,৫০০
🚂 ট্রেনে — বাজেট ভ্রমণকারীদের পছন্দ
কলকাতা থেকে গুয়াহাটিগামী একাধিক ট্রেন নিয়মিত চলে।
উল্লেখযোগ্য ট্রেন:
| ট্রেনের নাম | নম্বর | যাত্রা শুরু | সময় |
|---|---|---|---|
| সরাইঘাট এক্সপ্রেস | 12345 | হাওড়া | প্রায় ১৭-১৮ ঘণ্টা |
| কামরূপ এক্সপ্রেস | 15959 | হাওড়া | প্রায় ১৮-১৯ ঘণ্টা |
| ব্রহ্মপুত্র মেল | 15646 | হাওড়া | প্রায় ১৯-২০ ঘণ্টা |
ভাড়া (আনুমানিক): স্লিপার ক্লাস ₹৫০০–₹৭০০, থার্ড AC ₹১,২০০–₹১,৮০০ প্রতি জন।
💡 গুরুত্বপূর্ণ: বর্ষার মৌসুমে (জুলাই-অগাস্ট) ট্রেনের টিকিট আগে থেকে বুক করুন। ৬০ দিন আগে থেকে বুকিং শুরু হয় — দেরি না করাই ভালো।
🚌 বাসে — সুপারিশযোগ্য নয় বর্ষায়
কলকাতা থেকে সরাসরি শিলং পর্যন্ত বাস পাওয়া যায়, তবে সময় লাগে ২০-২৪ ঘণ্টার বেশি। বর্ষায় পাহাড়ি রাস্তায় এত দীর্ঘ বাসযাত্রা ক্লান্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিমান বা ট্রেনকেই অগ্রাধিকার দিন।
🚗 শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি
শিলং থেকে চেরাপুঞ্জির দূরত্ব প্রায় ৫৪ কিমি। গাড়িতে সময় লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।
- শেয়ার্ড ট্যাক্সি (পুলিশ বাজার থেকে): প্রতি জন ₹১৫০–₹২০০ (সারাদিন পাওয়া যায় না, সকালে যাওয়াই ভালো)
- প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া: শুধু যাওয়া ₹১,৫০০–₹২,০০০ | দিনের সাইটসিয়িং সহ ₹৩,০০০–₩৩,৫০০
রাস্তাটি নিজেই একটি অভিজ্ঞতা — মেঘের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এগিয়ে যাওয়া, দুপাশে গভীর উপত্যকা, আর আচমকা একটা জলপ্রপাত দেখতে পাওয়া।
কোথায় থাকবেন
শিলং-এ থাকার জায়গা
শিলং শহরে থাকার অনেক বিকল্প আছে — সব বাজেটের জন্য।
বাজেট বিকল্প (₹৮০০–₹১,৫০০/রাত):
পুলিশ বাজার এলাকায় প্রচুর গেস্টহাউস ও লজ আছে। শিলংয়ে হোমস্টে কালচার খুব জনপ্রিয় — স্থানীয় পরিবারের সঙ্গে থাকলে সত্যিকারের খাসি জীবনযাত্রার স্বাদ পাবেন। এগুলো Airbnb বা MakeMyTrip-এ খুঁজুন।
মিড-রেঞ্জ বিকল্প (₹১,৫০০–₩৩,৫০০/রাত):
- হোটেল পাইনউড — মেঘালয় পর্যটন বিভাগের হোটেল, সুন্দর বাগান ও ঐতিহাসিক পরিবেশ। আগে থেকে বুক করুন, খুব জনপ্রিয়।
- হোটেল রি কিনমাও — পুলিশ বাজার থেকে কাছে, সুবিধাজনক অবস্থান।
- হোটেল সেন্ট্রাল পয়েন্ট — শহরের কেন্দ্রে, যোগাযোগ ভালো।
প্রিমিয়াম বিকল্প (₹৩,৫০০+/রাত):
- হোটেল পোলো টাওয়ার্স — শিলংয়ের অন্যতম প্রধান হোটেল, বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধা।
- রেডিসন ব্লু শিলং — আন্তর্জাতিক মানের হোটেল।
চেরাপুঞ্জিতে থাকার জায়গা
চেরাপুঞ্জিতে রাত কাটানো একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। সন্ধ্যার পর মেঘের চাদরে মোড়া উপত্যকা দেখার সুযোগ শুধু এখানে থাকলেই পাবেন।
মিড-রেঞ্জ বিকল্প (₹২,০০০–₹৪,০০০/রাত):
- চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসোর্ট — সবচেয়ে জনপ্রিয়, জলপ্রপাতের ভিউ পাওয়া যায়। বর্ষায় আগেভাগে বুক করুন।
- পোলো অর্কিড রিসোর্ট — সুন্দর পরিবেশ, মিষ্টি কর্মীরা।
বাজেট বিকল্প (₹৮০০–₹১,৫০০/রাত):
- La Mer Cottages ও স্থানীয় গেস্টহাউস — সাশ্রয়ী, তবে সুবিধা সীমিত।
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ: বর্ষায় চেরাপুঞ্জিতে রাতে বেশ ঠান্ডা পড়ে (১৫°C বা নীচে)। গরম কাপড় অবশ্যই নিন। সন্ধ্যার পর ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে যায়।
কী কী দেখবেন
চেরাপুঞ্জিতে
১. নোহকালিকাই জলপ্রপাত (Nohkalikai Falls)
ভারতের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত — উচ্চতা প্রায় ৩৪০ মিটার। জুলাই-অগাস্টে এটি তার পুরো শক্তিতে থাকে। উপর থেকে তাকালে দেখবেন সাদা জলরাশি সরাসরি নীল-সবুজ রঙের ছোট লেকে আছড়ে পড়ছে। মেঘের মধ্যে জলপ্রপাতের এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা কঠিন, কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে যায়।
২. সেভেন সিস্টার্স ফলস (Nohsngithiang Falls)
চেরাপুঞ্জি থেকে মাওসমাই রোডে কিছুটা যেতেই পাহাড়ের গা বেয়ে সাতটা আলাদা জলধারা পাশাপাশি নেমে আসতে দেখবেন। শুধু বর্ষায় এই সাতটি ধারা একসঙ্গে সক্রিয় থাকে — এ কারণেই জুলাই-অগাস্ট সেরা সময়।
৩. মাওসমাই গুহা (Mawsmai Cave)
চুনাপাথরের তৈরি এই গুহা প্রায় ১৫০ মিটার দীর্ঘ। ভেতরে অদ্ভুত সুন্দর স্ট্যালাক্টাইট ও স্ট্যালাগমাইট গঠন — মিলিয়ন বছর ধরে পানি চুয়ে চুয়ে তৈরি। কিছু জায়গায় রাস্তা সরু, একটু নুয়ে যেতে হয়। শিশু ও বয়স্কদের জন্য সহজ।
৪. ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ (Double Decker Living Root Bridge)
এটি চেরাপুঞ্জি ভ্রমণের মুকুটমণি। নোংরিয়াত গ্রামে গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি এই সেতু মেঘালয়ের খাসি জনজাতির অসাধারণ কারিগরি সৃষ্টি। পৌঁছাতে হলে তির্না (Tyrna) গ্রাম থেকে প্রায় ৩,৫০০ সিঁড়ি নেমে যেতে হবে এবং ফেরার সময় একই সিঁড়ি উঠতে হবে। সময় লাগে যাওয়া-আসা মিলিয়ে ৪-৫ ঘণ্টা।
⚠️ ট্রেক সতর্কতা: বর্ষায় পথ পিচ্ছিল। গ্রিপযুক্ট ট্রেকিং জুতো অবশ্যই পরুন। স্থানীয় গাইড নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ (খরচ ₹৫০০–₹৮০০)। শারীরিকভাবে যথেষ্ট সুস্থ না হলে এই ট্রেক এড়িয়ে যান।
৫. বাংলাদেশ ভিউপয়েন্ট ও ইকো পার্ক
পরিষ্কার দিনে এই দৃষ্টিবিন্দু থেকে বাংলাদেশের সমতলভূমি দেখা যায়। বর্ষায় মেঘে ঢাকা থাকলেও পারিপার্শ্বিক সবুজ অসাধারণ।

শিলং-এ
১. এলিফ্যান্ট ফলস (Elephant Falls)
শিলং শহর থেকে প্রায় ১২ কিমি দূরে, তিন স্তরবিশিষ্ট জলপ্রপাত। বর্ষায় পানি বেশি থাকে, শব্দ ও দৃশ্য দুটোই মনোরম। প্রবেশমূল্য সামান্য।
২. ওয়ার্ডস লেক (Wards Lake)
শিলং শহরের মধ্যে কৃত্রিম হ্রদ। চারপাশে ফুলের বাগান, হাঁসের দল, বোটিংয়ের সুবিধা। সন্ধ্যায় এখানে হাঁটা খুব আনন্দদায়ক।
৩. ডন বসকো সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস কালচার (Don Bosco Museum)
উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনজাতিসমূহের উপর নির্মিত এক অসাধারণ সাততলা মিউজিয়াম। শেষ তলায় স্কাইওয়াক থেকে শিলং শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়। ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে আগ্রহীদের জন্য অবশ্য-দর্শনীয়।
৪. শিলং পিক (Shillong Peak)
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৯৬৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত শিলংয়ের সর্বোচ্চ বিন্দু। পরিষ্কার দিনে পুরো শিলং শহর দেখা যায়। ভারতীয় বায়ুসেনার নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রবেশ নিয়মিতভাবে উন্মুক্ত নয় — যাওয়ার আগে চেক করুন।
৫. পুলিশ বাজার ও লেডি হায়দারি পার্ক
শিলংয়ের প্রাণকেন্দ্র পুলিশ বাজারে স্থানীয় খাবার খান, হস্তশিল্প কিনুন, পাহাড়ি মশলা ও চা কিনুন। লেডি হায়দারি পার্কে ছোট চিড়িয়াখানা ও অর্কিড বাগান আছে।
খাওয়া-দাওয়া — খাসি রান্নার স্বাদ নিন
মেঘালয়ে গিয়ে স্থানীয় খাসি রন্ধনশৈলী না খেলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অবশ্যই চেখে দেখবেন:
- জাডো (Jadoh): লাল চালের ভাত ও শুয়োরের মাংস বা মুরগি দিয়ে রান্না ঐতিহ্যবাহী খাবার — মেঘালয়ের “ভাত-তরকারি”।
- ডোহ খ্লেহ (Doh Khleh): মশলায় মাখা শুয়োরের সালাড, তীক্ষ্ণ স্বাদ।
- পুখলেইন (Pukhein): চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি মিষ্টি পিঠা, নাস্তার জন্য দারুণ।
- তুং রিমব্বাই (Tung Rymbai): গাঁজানো সয়াবিন, তীব্র গন্ধ কিন্তু অনন্য স্বাদ।
- খাসি পোর্ক স্টু: মেঘালয়ের যেকোনো রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায়, শীতের রাতে গরম গরম খেলে অসাধারণ।
শিলংয়ে বাঙালি খাবারের রেস্তোরাঁও প্রচুর। পুলিশ বাজার চত্বরে সব বাজেটের খাওয়ার জায়গা পাবেন। চেরাপুঞ্জিতে রিসোর্টের খাবার মোটামুটি ভালো, তবে বিকল্প সীমিত।
৫ রাত / ৬ দিনের সুপারিশকৃত ট্যুর পরিকল্পনা
| দিন | গন্তব্য | মূল কার্যক্রম |
|---|---|---|
| দিন ১ | কলকাতা → গুয়াহাটি → শিলং | ভ্রমণ, পৌঁছানো, পুলিশ বাজারে সন্ধ্যায় ঘোরাফেরা |
| দিন ২ | শিলং | এলিফ্যান্ট ফলস, ওয়ার্ডস লেক, ডন বসকো মিউজিয়াম, লেডি হায়দারি পার্ক |
| দিন ৩ | শিলং → চেরাপুঞ্জি | সেভেন সিস্টার্স ফলস, মাওসমাই গুহা, নোহকালিকাই ভিউপয়েন্ট, চেরাপুঞ্জিতে রাত |
| দিন ৪ | চেরাপুঞ্জি | ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ সারাদিনের ট্রেক, বাংলাদেশ ভিউপয়েন্ট |
| দিন ৫ | চেরাপুঞ্জি → শিলং → গুয়াহাটি | ইকো পার্ক, কেনাকাটা, গুয়াহাটিতে রাত (ঐচ্ছিক: ডাউকি/মাওলিননং যোগ করুন) |
| দিন ৬ | গুয়াহাটি → কলকাতা | ফেরার পথ, কামাখ্যা মন্দির দর্শন (সময় থাকলে) |
খরচের আনুমানিক হিসাব — দুজনের জন্য, মিড-রেঞ্জ বাজেট
| খরচের খাত | আনুমানিক পরিমাণ (₹) |
|---|---|
| বিমান টিকিট (কলকাতা↔গুয়াহাটি, ২ জন, যাতায়াত) | ₹১০,০০০–₹১৮,০০০ |
| গুয়াহাটি ↔ শিলং যাতায়াত (শেয়ার্ড/প্রাইভেট) | ₹১,৫০০–₹৩,০০০ |
| শিলং ও চেরাপুঞ্জিতে স্থানীয় গাড়ি ভাড়া (৪ দিন) | ₹৮,০০০–₹১২,০০০ |
| হোটেল — শিলং (২ রাত, ডবল রুম) | ₹৩,০০০–₩৭,০০০ |
| হোটেল — চেরাপুঞ্জি (২ রাত, ডবল রুম) | ₹৪,০০০–₹৮,০০০ |
| হোটেল — গুয়াহাটি (১ রাত) | ₹১,৫০০–₹৩,০০০ |
| খাওয়া (৫ দিন, ২ জন) | ₹৪,০০০–₹৬,০০০ |
| প্রবেশমূল্য, গাইড ও বিবিধ | ₹২,০০০–₹৩,০০০ |
| মোট আনুমানিক | ₹৩৪,০০০–₹৬০,০০০ |
💡 বাঁচানোর উপায়: ট্রেনে (থার্ড AC) গেলে পরিবহন খরচ ₹৫,০০০–₹৮,০০০ কমে যাবে। শেয়ার্ড ট্যাক্সি ব্যবহার করলে আরও সাশ্রয়।
ℹ️ লক্ষ্য করুন: মেঘালয়ে রাজ্যের বাইরের যানবাহন চলে না। শিলং বা গুয়াহাটিতে পৌঁছে স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করতে হবে।
জরুরি টিপস — বর্ষার চেরাপুঞ্জিতে না জানলে বিপদ
পোশাক ও সরঞ্জাম:
- ভালো মানের রেনকোট অবশ্যই নিন — চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিতে ছাতা কার্যকর নয়।
- ওয়াটারপ্রুফ ব্যাকপ্যাক বা ব্যাগের জন্য রেইন কভার নিন।
- লিভিং রুট ব্রিজ ট্রেকের জন্য গ্রিপযুক্ট ট্রেকিং জুতো বাধ্যতামূলক — স্পোর্টস স্যান্ডেল বা চপ্পল পরে ট্রেক করবেন না।
- গরম কাপড়: রাতে চেরাপুঞ্জিতে ১৪-১৫°C পর্যন্ত ঠান্ডা হতে পারে।
টাকা ও যোগাযোগ:
- চেরাপুঞ্জিতে ATM অত্যন্ত সীমিত। শিলং থেকে যথেষ্ট নগদ তুলে নিন।
- মেঘালয়ের কিছু এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল। BSNL ও Jio তুলনামূলক ভালো কাজ করে।
নিরাপত্তা:
- বর্ষায় পাহাড়ি রাস্তায় মাঝেমাঝে ছোট ধস হতে পারে। স্থানীয় চালক ও প্রশাসনের পরামর্শ মানুন।
- রাতে একা পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করবেন না।
পরিবেশ:
- মেঘালয়ের প্রকৃতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্লাস্টিক বোতল ও প্যাকেটিং বহন করবেন না, নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন।
🙋 FAQ — প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: জুলাই-অগাস্টে চেরাপুঞ্জি যাওয়া কি নিরাপদ?
উত্তর: হ্যাঁ, সাধারণত নিরাপদ এবং এটাই চেরাপুঞ্জির সেরা সময়। তবে বর্ষায় পাহাড়ি রাস্তায় মাঝেমাঝে ধসের সম্ভাবনা থাকে। প্রতিদিনের আবহাওয়া বুলেটিন দেখুন এবং স্থানীয় গাইডের নির্দেশ মানুন।
প্রশ্ন: কলকাতা থেকে চেরাপুঞ্জি পৌঁছাতে কত সময় লাগে?
উত্তর: বিমানে গেলে — কলকাতা থেকে গুয়াহাটি ১ ঘণ্টা, গুয়াহাটি থেকে শিলং ৩ ঘণ্টা, শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি ২ ঘণ্টা — মোট প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা (ট্রানজিট সময় ধরে)। ট্রেনে গেলে কলকাতা থেকে গুয়াহাটি ১৭-১৮ ঘণ্টা, তারপর সড়কপথে আরও ৫-৬ ঘণ্টা।
প্রশ্ন: চেরাপুঞ্জিতে কতদিন থাকা উচিত?
উত্তর: অন্তত ২ রাত থাকুন। প্রথম দিন নোহকালিকাই, সেভেন সিস্টার্স ফলস, মাওসমাই গুহা; দ্বিতীয় দিন পুরোটা লিভিং রুট ব্রিজ ট্রেকের জন্য রাখুন।
প্রশ্ন: শিলং ও চেরাপুঞ্জি একসঙ্গে দেখতে কতদিনের ট্যুর লাগে?
উত্তর: ৫-৬ দিন আদর্শ। ৪ দিনেও সম্ভব কিন্তু তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: জুলাই-অগাস্টে মেঘালয়ে তাপমাত্রা কত থাকে?
উত্তর: শিলংয়ে সাধারণত ১৪°C–২০°C। চেরাপুঞ্জিতে একটু বেশি আর্দ্র, তাপমাত্রা ১৫°C–২২°C দিনে; রাতে ১৩–১৬°C নামতে পারে।
প্রশ্ন: চেরাপুঞ্জিতে কি ATM আছে?
উত্তর: অত্যন্ত সীমিত এবং বর্ষায় কাজ নাও করতে পারে। শিলং থেকে যথেষ্ট নগদ তুলে নিন।
প্রশ্ন: লিভিং রুট ব্রিজ কি বর্ষায় দেখা সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ সম্ভব এবং বর্ষায় চারপাশ আরও সবুজ থাকে। তবে পথ পিচ্ছিল হয়, গ্রিপযুক্ত জুতো ও সতর্কতা আবশ্যক।
প্রশ্ন: মেঘালয়ে কি ভারতীয়দের বিশেষ পারমিট লাগে?
উত্তর: না। মেঘালয়ে সাধারণ ভারতীয় নাগরিকদের কোনো ইনার লাইন পারমিট (ILP) লাগে না। তবে অরুণাচল প্রদেশ বা মিজোরামের জন্য ILP প্রয়োজন।
প্রশ্ন: চেরাপুঞ্জি থেকে কি ডাউকি যাওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, ডাউকি (Dawki) চেরাপুঞ্জি থেকে প্রায় ৮২ কিমি। সেখানে উমনগট নদীর স্বচ্ছ জল বিখ্যাত। তবে বর্ষায় নদী খরস্রোতা থাকে এবং বোটিং নিষিদ্ধ হতে পারে।
উপসংহার — মেঘ ডাকছে, সাড়া দিন
চেরাপুঞ্জি আর শিলং — এই দুটো নাম শুনলেই মনে হয় মেঘের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া যায়। জুলাই-অগাস্টে যখন সারা ভারত গরম আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় হাঁপিয়ে উঠছে, তখন এই দুই শহর তাদের সেরা রূপে সজ্জিত।
নোহকালিকাই জলপ্রপাতের গর্জন, লিভিং রুট ব্রিজের শিকড়ে হাত রাখার অনুভূতি, মেঘের চাদরে মোড়া সন্ধ্যার উপত্যকা, শিলংয়ের কোনো ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে গরম কফির চুমুক — এগুলো শুধু দেখার নয়, অনুভব করার।
কলকাতা থেকে মাত্র একটি ফ্লাইটের দূরত্বে এই অপার্থিব সৌন্দর্য। তাহলে আর দেরি কেন? ব্যাগ গুছিয়ে নিন, রেনকোট বের করুন, এবং রওনা দিন মেঘের রাজ্যে — মেঘালয় আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
এই পোস্টটি সহায়ক মনে হলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করুন। ভ্রমণ সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্ন কমেন্টে জানান — আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷

