পুরী-কোণার্কের ভিড় এড়িয়ে ওড়িশার অজানা সমুদ্র সৈকতে যেতে চান? চাঁদিপুর, তালসারি, আস্তারাং, রুশিকুল্য-সহ ৭টি গোপন সৈকতের সম্পূর্ণ গাইড ।

পুরী। কোণার্ক। চিলকা।
ওড়িশা ভ্রমণের কথা উঠলেই এই তিনটি নাম সবার আগে মাথায় আসে। ডিসেম্বরে পুরীর সমুদ্র সৈকতে হাজার হাজার পর্যটকের ভিড়, ছোট ছোট দোকানের লাইন, অটো-রিকশার হর্ন — এই ছবিটা আপনিও নিশ্চয়ই চেনেন। কিন্তু ভেবে দেখুন তো — এই ওড়িশারই প্রায় ৪৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রতীর রয়েছে। সেই দীর্ঘ উপকূলরেখার বেশিরভাগটাই আজও অনাবিষ্কৃত, নিঃশব্দ, ভিড়হীন।
আপনি যদি সত্যিকারের সমুদ্রপ্রেমী হন — যদি পায়ের তলায় নরম বালি আর কানে ঢেউয়ের গর্জন ছাড়া আর কিছু না চান — তাহলে এই লেখাটা শুধু আপনার জন্যই।
আজ আমি আপনাকে নিয়ে যাব ওড়িশার সেই সব গোপন সমুদ্র সৈকতে, যেখানে পর্যটকের পদচিহ্ন এখনও বিরল, যেখানে সূর্যোদয়ের সময় কোনো ভিড় নেই, শুধু আছে অসীম নীল আর আপনি।
ওড়িশার কোন সমুদ্র সৈকতগুলো কম পরিচিত?
ওড়িশার উপকূল মূলত তিনটি জেলায় বিভক্ত — উত্তরে বালেশ্বর ও ভদ্রক, মাঝে কেন্দ্রাপড়া, জগৎসিংহপুর ও পুরী, আর দক্ষিণে গঞ্জাম। পুরী ও কোণার্ক যেখানে, সেই মাঝবরাবর অঞ্চলটাই পর্যটকদের মূল গন্তব্য। কিন্তু উত্তর আর দক্ষিণের সৈকতগুলো প্রায় অছোঁয়া।
১. চাঁদিপুর — যেখানে সমুদ্র হেঁটে চলে যায়

জেলা: বালেশ্বর
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ২৩০ কিলোমিটার
চাঁদিপুরের কথা বলতে হলে আগে বলতে হয় তার সেই অদ্ভুত রহস্যের কথা। দিনে দুবার — ভাটার সময় — চাঁদিপুরের সমুদ্র প্রায় ৫ কিলোমিটার পিছিয়ে যায়। হ্যাঁ, ঠিকই পড়লেন। সমুদ্র যেন হেঁটে চলে যায়। আর জোয়ারে ফিরে আসে। এই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় শুধুমাত্র চাঁদিপুরেই। ভাটার সময় শুকনো সমুদ্রের তলায় হেঁটে বেড়ানো, শামুক-ঝিনুক কুড়ানো, কাঁকড়ার পেছনে ছোটা — এগুলো চাঁদিপুরের অনন্য অভিজ্ঞতা।
এখানে কোনো বড় পর্যটক কেন্দ্র নেই, নেই কোলাহল। শুধু আছে বালি, ঝাউবন আর রহস্যময় সমুদ্র।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন:
- ট্রেনে হাওড়া থেকে বালেশ্বর স্টেশন (হাওড়া-পুরী এক্সপ্রেস, শালিমার-পুরী এক্সপ্রেস বা যেকোনো ওড়িশাগামী ট্রেন)। যাত্রাকাল প্রায় ৩–৩.৫ ঘণ্টা। বালেশ্বর থেকে অটো বা ট্যাক্সিতে চাঁদিপুর মাত্র ১৬ কিলোমিটার।
- সড়কপথে NH-১৬ ধরে সরাসরি যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন: ওডিশা পর্যটনের Panthanivas Chandipur গেস্টহাউস সবচেয়ে ভালো বিকল্প। এ ছাড়া বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আছে।
আনুমানিক খরচ (দুজনের জন্য, ২ রাত): ৫,০০০–৮,০০০ টাকা (থাকা-খাওয়া সমেত)
২. তালসারি — বাংলার দোরগোড়ায় ওড়িশার স্পর্শ

জেলা: বালেশ্বর
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ২০৫ কিলোমিটার
সুবর্ণরেখা নদী যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে, ঠিক সেই মোহনার পাশেই তালসারি সৈকত। ওড়িশা আর পশ্চিমবঙ্গের সীমানার কাছাকাছি এই সৈকত কলকাতা থেকে সবচেয়ে কাছের ওড়িশার সমুদ্র সৈকতগুলোর একটি।
তালসারির বিশেষত্ব হল এর নিস্তব্ধতা। লাল কাঁকড়ার দল বালির ওপর দিয়ে ছুটে বেড়ায়। নদী আর সমুদ্রের মিলনস্থলে নৌকায় ভেসে পড়া এক অন্য আনন্দ। ঝাউগাছের ছায়ায় বসে দিগন্তে সূর্যাস্ত দেখা — এই মুহূর্তগুলো সহজে ভোলার নয়।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন:
- হাওড়া থেকে বালেশ্বর ট্রেন, তারপর অটো বা শেয়ার গাড়িতে তালসারি (প্রায় ৩৫ কিলোমিটার)।
- ধর্মতলা থেকে সরাসরি বাস পাওয়া যায় বালেশ্বর পর্যন্ত। রাতের বাস ধরলে সকালে পৌঁছানো যায়।
- নিজের গাড়িতে NH-১৬ ধরে মাত্র ৪–৪.৫ ঘণ্টার পথ।
কোথায় থাকবেন: OTDC-র Talsari Beach Resort রয়েছে। এ ছাড়া সুবর্ণরেখা নদীর তীরে কিছু ছোট হোমস্টেও পাওয়া যায়।
আনুমানিক খরচ (দুজনের জন্য, ২ রাত): ৪,০০০–৭,০০০ টাকা
আরও পড়ুন :- ওড়িশায় একক ভ্রমণ, সেরা ৩টি গন্তব্য জেনে নিন
৩. আস্তারাং — অজানার ঠিকানা

জেলা: পুরী
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার
পুরী থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে আস্তারাং, কিন্তু পর্যটকদের ভিড় থেকে যোজন যোজন দূরে। দয়া নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মিলনে তৈরি এই সৈকতটি এখনও অচেনা, আনকোরা।
আস্তারাংয়ের বিশেষত্ব হল এখানকার জেলেপাড়া। ভোরবেলা জেলেদের নৌকা নামানো, মাছ ধরা ফিরে আসা, নদীর মোহনায় পাখির কলকাকলি — এগুলো একটা অন্য দুনিয়ার অনুভব দেয়। যদি কোনো অনভিজ্ঞ গ্রামীণ পর্যটন চান, তাহলে আস্তারাং আপনার পছন্দের তালিকায় থাকুক।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন:
- হাওড়া থেকে পুরীগামী ট্রেনে পুরী স্টেশন (প্রায় ৮–৯ ঘণ্টা)। পুরী থেকে অটো বা ট্যাক্সিতে আস্তারাং।
- বাসে কলকাতা থেকে সরাসরি পুরী, তারপর স্থানীয় যানবাহন।
কোথায় থাকবেন: আস্তারাংয়ে বড় হোটেল নেই। কিছু স্থানীয় গেস্টহাউস আর হোমস্টে আছে। পুরীতে থেকেও ডে-ট্রিপ করা যায়।
আনুমানিক খরচ (দুজনের জন্য, ডে ট্রিপ): ৮০০–১,৫০০ টাকা (পুরী থেকে)
৪. দেবী মোহনা — কোণার্কের গোপন পড়শি
জেলা: পুরী
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার
কোণার্কের সূর্য মন্দির থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে দেবী নদী সমুদ্রে মিলেছে — এই মোহনার নাম দেবী মোহনা। এখানে একটি ছোট্ট কালী মন্দির আছে, আর আছে বিস্তৃত নির্জন সৈকত।
কোণার্কে গেলে বেশিরভাগ পর্যটক মন্দির দেখেই ফিরে যান। দেবী মোহনার খোঁজ কেউ রাখেন না। কিন্তু এই জায়গাটা যারা একবার দেখেছেন, তারা বলেন — এটাই ছিল তাঁদের সফরের সেরা মুহূর্ত। নদীর মোহনায় মাছ ধরার নৌকা, পেলিকান-সহ নানা প্রজাতির পাখি, আর দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা নীল জল।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন:
- ট্রেনে পুরী বা ভুবনেশ্বর, তারপর সড়কপথে কোণার্ক হয়ে দেবী মোহনা।
- কোণার্ক থেকে অটো বা বাইক ভাড়ায় সহজে যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন: কোণার্কে OTDC-র হোটেল বা পুরীতে থেকে ডে-ট্রিপ।
আনুমানিক খরচ: কোণার্ক বেসে থেকে ডে-ট্রিপ — ৫০০–১,০০০ টাকা
আরও পড়ুন — ওডিশায় শীতে সেরা ১০টি ট্রেকিং স্পট – অ্যাডভেঞ্চার গাইড
৫. রুশিকুল্য — কচ্ছপের রাতের উৎসব

জেলা: গঞ্জাম
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ৬৩০ কিলোমিটার
রুশিকুল্য শুধু একটা সমুদ্র সৈকত নয়, এটা একটা অলৌকিক অভিজ্ঞতার নাম। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে লক্ষ লক্ষ অলিভ রিডলি কচ্ছপ রাতের অন্ধকারে এই সৈকতে উঠে আসে ডিম পাড়তে। এই দৃশ্য “অরিবাডা” নামে পরিচিত — এবং এটা পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম সামুদ্রিক কচ্ছপের বাসা বাঁধার ঘটনা।
ভাবুন একবার — রাতের নিস্তব্ধ সৈকতে চাঁদের আলোয় হাজার হাজার কচ্ছপ বালিতে ডিম পুঁতছে। এর চেয়ে বেশি রোমাঞ্চকর দৃশ্য প্রকৃতি আর কী দিতে পারে?
তবে একটা কথা মনে রাখবেন — এখানে পর্যটকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। স্থানীয় বন দফতরের অনুমতি নিয়ে যেতে হয়। আলো জ্বালানো, শব্দ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্রকৃতিকে ভালোবাসলে এই নিয়মগুলো মেনে চলুন।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন:
- হাওড়া থেকে ট্রেনে বেরহামপুর (গঞ্জাম)। ট্রেন যাত্রাকাল ১০–১২ ঘণ্টা। বেরহামপুর থেকে রুশিকুল্য প্রায় ৩০ কিলোমিটার, অটো বা ট্যাক্সিতে।
- ভুবনেশ্বর বা পুরী থেকেও আসা যায়।
কোথায় থাকবেন: কবীরধাম বা বেরহামপুরে হোটেল। রুশিকুল্যের কাছাকাছি কিছু হোমস্টেও তৈরি হচ্ছে।
আনুমানিক খরচ (দুজনের জন্য, ২ রাত): ৭,০০০–১০,০০০ টাকা (যাতায়াত-সহ)
৬. আর্যাপল্লী — গঞ্জামের নিভৃত মুক্তো

জেলা: গঞ্জাম
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার
গোপালপুর-অন-সি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে আর্যাপল্লী। গোপালপুর ইদানীং বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে, কিন্তু আর্যাপল্লী এখনও একেবারে কুমারী। কোনো ট্যুরিস্ট অবকাঠামো নেই, কোনো বোর্ড নেই, কোনো দোকান নেই — শুধু অসীম সমুদ্র আর বালি।
এখানকার সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত এবং জলের রঙ অসাধারণ ফিরোজা নীল। ছোট ছোট মাছধরার গ্রাম আছে, যেখানে মানুষ এখনও পুরনো জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। যদি সত্যিকারের ওড়িশা দেখতে চান — পর্যটন বাণিজ্যের প্রলেপ মুছে — তাহলে আর্যাপল্লীই আপনার গন্তব্য।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন:
- হাওড়া থেকে ট্রেনে বেরহামপুর বা গোপালপুর রোড স্টেশন। তারপর অটো বা গাড়িতে আর্যাপল্লী।
কোথায় থাকবেন: গোপালপুর-এ থেকে ডে-ট্রিপ সবচেয়ে সুবিধাজনক। গোপালপুরে বাজেট থেকে মাঝারি মানের বেশ কিছু হোটেল আছে।
আনুমানিক খরচ (দুজনের জন্য, ২ রাত): ৬,০০০–৯,০০০ টাকা
৭. গাহিরমাথা — ভারতের বৃহত্তম কচ্ছপ অভয়ারণ্যের সৈকত

জেলা: কেন্দ্রাপড়া
কলকাতা থেকে দূরত্ব: প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার
গাহিরমাথা হল ভারতের বৃহত্তম অলিভ রিডলি কচ্ছপের বাসা বাঁধার সৈকত এবং এটি একটি সংরক্ষিত এলাকা। সরাসরি সৈকতে প্রবেশ অনুমতিসাপেক্ষ, কিন্তু কাছাকাছি ভিটারকানিকা ম্যানগ্রোভ অরণ্য একটি অবিশ্বাস্য গন্তব্য।
নৌকায় ভিটারকানিকার ম্যানগ্রোভে ঘুরতে ঘুরতে লবণাক্ত জলের কুমির, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, আর দূরে গাহিরমাথার সৈকত — এই অভিজ্ঞতা যে কোনো ট্রাভেলারের জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকে। শীতকালে পাখির অভিবাসনের সময় এখানকার আকাশ পাখিতে ভরে ওঠে।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন:
- হাওড়া থেকে ট্রেনে ভদ্রক বা কেন্দ্রাপড়া রোড স্টেশন। তারপর গাড়িতে রাজনগর ও ভিটারকানিকা।
- বা ভুবনেশ্বর থেকে সড়কপথে কেন্দ্রাপড়া হয়ে রাজনগর।
কোথায় থাকবেন: OTDC-র ভিটারকানিকা নেচার ক্যাম্প এবং কেন্দ্রাপড়ায় কিছু হোটেল।
আনুমানিক খরচ (দুজনের জন্য, ২ রাত): ৬,৫০০–১০,০০০ টাকা
আরও পড়ুন :- ভারতে দেশীয় ভ্রমণ বিমার প্রয়োজনীয়তা – একটি সম্পূর্ণ গাইড
কলকাতা থেকে ওড়িশার অফবিট সৈকতে যাওয়ার সেরা উপায়
ট্রেনপথ — সবচেয়ে সুবিধাজনক
হাওড়া থেকে বালেশ্বর, ভদ্রক, কটক, ভুবনেশ্বর বা বেরহামপুর — সব গন্তব্যেই ট্রেন পাওয়া যায়। কিছু উল্লেখযোগ্য ট্রেন:
- হাওড়া-পুরী এক্সপ্রেস (১২৮৩৭)
- শালিমার-পুরী সুপারফাস্ট (২২৮৭৩)
- হাওড়া-বেঙ্গালুরু দুরন্ত (ভুবনেশ্বর হয়ে)
- ফলকনামা এক্সপ্রেস
স্লিপার ক্লাস ভাড়া: ২০০–৪৫০ টাকা (গন্তব্য অনুযায়ী)
3AC ভাড়া: ৫৫০–১,২০০ টাকা
সড়কপথ — স্বাধীনতার সেরা আনন্দ
নিজের গাড়িতে বা ভাড়ার গাড়িতে NH-16 ধরে যাওয়া সবচেয়ে আনন্দের। রাস্তা ভালো, পেট্রোল পাম্প ও ধাবা প্রচুর। বালেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ৪.৫ ঘণ্টা, ভুবনেশ্বর পর্যন্ত ৭–৮ ঘণ্টা।
গাড়ি ভাড়া (কলকাতা থেকে, রাউন্ড ট্রিপ): ৮,০০০–১৫,০০০ টাকা (৪ দিনের জন্য, ৪ জনের জন্য ভাগাভাগি করলে সাশ্রয়ী)
বাসপথ
ধর্মতলা বা এস্প্ল্যানেড থেকে বেসরকারি ভলভো বা সাধারণ বাস পাওয়া যায় বালেশ্বর, ভদ্রক, ভুবনেশ্বর, পুরী এবং বেরহামপুরে।
ভাড়া: ৩০০–৮০০ টাকা (বাসের ধরন অনুযায়ী)
কোথায় থাকবেন: বিকল্পগুলো জেনে রাখুন
| সৈকত | থাকার বিকল্প | বাজেট (রাত প্রতি) |
|---|---|---|
| চাঁদিপুর | OTDC Panthanivas, বেসরকারি হোটেল | ৮০০–২,৫০০ টাকা |
| তালসারি | OTDC Beach Resort, হোমস্টে | ৭০০–২,০০০ টাকা |
| আস্তারাং | পুরীতে থেকে ডে-ট্রিপ | পুরীতে ১,০০০–৩,০০০ টাকা |
| দেবী মোহনা | কোণার্ক বা পুরীতে বেস | ৮০০–২,৫০০ টাকা |
| রুশিকুল্য | বেরহামপুর হোটেল, হোমস্টে | ৮০০–২,০০০ টাকা |
| আর্যাপল্লী | গোপালপুরে বেস | ১,০০০–৩,০০০ টাকা |
| গাহিরমাথা | OTDC নেচার ক্যাম্প, কেন্দ্রাপড়া | ১,২০০–৩,০০০ টাকা |
টিপ: OTDC (ওড়িশা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন)-র হোটেলগুলো সরকারি, তাই অপেক্ষাকৃত সস্তা ও নিরাপদ। আগে থেকে অনলাইনে বুকিং করে রাখুন — otdc.co.in ওয়েবসাইটে।
সম্পূর্ণ ট্যুরের আনুমানিক খরচ (দুজনের জন্য, ৪ রাত–৫ দিন)
| খাতওয়ারি | আনুমানিক খরচ |
|---|---|
| ট্রেন যাতায়াত (স্লিপার, উভয়দিক) | ১,২০০–২,৪০০ টাকা |
| হোটেল (৪ রাত, দুজন) | ৪,০০০–৮,০০০ টাকা |
| খাওয়া-দাওয়া (দিনে ৫০০-৮০০ টাকা) | ২,৫০০–৪,০০০ টাকা |
| স্থানীয় যাতায়াত (অটো, ট্যাক্সি) | ১,৫০০–৩,০০০ টাকা |
| বিবিধ (এন্ট্রি, নৌকা, ইত্যাদি) | ৫০০–১,০০০ টাকা |
| মোট আনুমানিক | ৯,৭০০–১৮,৪০০ টাকা |
কখন যাবেন?
সেরা সময়: অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি
এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম, সমুদ্র শান্ত। রুশিকুল্য বা গাহিরমাথায় কচ্ছপ দেখতে চাইলে নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি আদর্শ।
এড়িয়ে চলুন: জুন–সেপ্টেম্বর (বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম, সমুদ্র বিপজ্জনক হতে পারে)।
অফবিট ট্রাভেলারদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ
১. আগে থেকে পরিকল্পনা করুন — অনেক জায়গায় ATM নেই, তাই যথেষ্ট নগদ সঙ্গে রাখুন।
২. জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন — বিশেষ করে চাঁদিপুরে এটা সবচেয়ে জরুরি।
৩. রুশিকুল্য ও গাহিরমাথায় আগে অনুমতি নিন — বন দফতরের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ।
৪. স্থানীয়দের সাথে কথা বলুন — তাঁরাই আপনাকে সেরা পথ, সেরা খাবার ও গোপন দৃশ্যের কথা বলবেন।
৫. প্লাস্টিক বর্জন করুন — এই নির্জন সৈকতগুলোকে পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
৬. সানক্রিম ও পানীয় জল সঙ্গে রাখুন — অনেক জায়গায় দোকান পাওয়া যায় না।
৭. প্রথমবার গেলে গাইড নিন — স্থানীয় গাইড অনেক অজানা তথ্য জানেন।
আরও পড়ুন – ভারতের বিখ্যাত মন্দির: যে 5 টি আপনাকে অবশ্যই দেখতে হবে
প্রায়ই জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: ওড়িশার সবচেয়ে কম পরিচিত সমুদ্র সৈকত কোনটি?
উত্তর: আস্তারাং, আর্যাপল্লী এবং দেবী মোহনা এখনও পর্যটন মানচিত্রে প্রায় অনুপস্থিত। এগুলোই ওড়িশার সবচেয়ে অজানা সমুদ্র সৈকত।
প্রশ্ন: কলকাতা থেকে ওড়িশার কোন সৈকতটি সবচেয়ে কাছে?
উত্তর: তালসারি এবং চাঁদিপুর — দুটোই বালেশ্বর জেলায়, কলকাতা থেকে ২০০–২৩০ কিলোমিটারের মধ্যে।
প্রশ্ন: ওড়িশায় কচ্ছপ দেখার সেরা সময় কোনটি?
উত্তর: নভেম্বর থেকে মার্চ, বিশেষত জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে রুশিকুল্য ও গাহিরমাথায় অলিভ রিডলি কচ্ছপের ব্যাপক সমাবেশ দেখা যায়।
প্রশ্ন: ওড়িশার অফবিট সৈকতে পরিবার নিয়ে যাওয়া কি নিরাপদ?
উত্তর: হ্যাঁ, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরিবার নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে সমুদ্রে অতিরিক্ত গভীরে না যাওয়াই ভালো।
প্রশ্ন: চাঁদিপুরে সমুদ্র কেন সরে যায়?
উত্তর: চাঁদিপুরের সমুদ্রতলের বিশেষ ভৌগোলিক গঠন এবং ভাটার প্রভাবে দিনে দুবার সমুদ্র ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। এটি বিশ্বের বিরলতম সমুদ্র তটের একটি।
প্রশ্ন: দুজনের জন্য ওড়িশা অফবিট ট্যুরে কত টাকা লাগে?
উত্তর: ৪–৫ দিনের ট্যুরে দুজনের জন্য প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা (যাতায়াত, থাকা, খাওয়া সমেত)।
শেষ কথা: সমুদ্র ডাকছে, সাড়া দেবেন কি?
পুরীর সৈকতে ডেকচেয়ারে শুয়ে সেলফি তোলা — এটাও ভালো। কিন্তু যদি একবার চাঁদিপুরের ভাটায় শুকনো সমুদ্রতলে হেঁটে দেখেন, বা রুশিকুল্যের রাতে কচ্ছপের ডিম পাড়া দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, বা তালসারিতে সুবর্ণরেখার মোহনায় সূর্যাস্ত দেখে মন ভরে যায় — তাহলে বুঝতে পারবেন, সমুদ্র মানে শুধু সৈকত নয়, সমুদ্র মানে একটা আস্ত অনুভূতি।
ওড়িশার এই লুকানো সৈকতগুলো আপনার জন্য অপেক্ষা করছে — নিঃশব্দে, ভিড়হীনভাবে, সম্পূর্ণ আপনার মতো করে। একবার যান। ফিরে আসতে মন চাইবে না।
এই ব্লগ পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আপনার ওড়িশার অফবিট সৈকতের অভিজ্ঞতা থাকলে কমেন্টে জানান — আমরা পরবর্তী পোস্টে আপনার গল্পও তুলে ধরব।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷
