হরিপুর সমুদ্র সৈকত, পূর্ব মেদিনীপুরের প্রায় অজানা এক মায়াবী বেলাভূমি তাদের জন্যই, যারা কোলাহল নয়, বরং ঢেউয়ের গর্জন ও হাওয়ার গুঞ্জন শুনতে চান।
দিঘা বা মন্দারমণির মতো গমগমে সমুদ্র সৈকত যখন পর্যটকদের ভিড়ে রূপ হারায়, ঠিক তখনই বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে নিঃশব্দে ভেসে ওঠে এক মায়াবী বেলাভূমি—হরিপুর। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি (Contai) মহকুমার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এই সৈকতটি তাদের জন্যই, যারা সমুদ্রের কাছে কোলাহল নয়, বরং ঢেউয়ের গর্জন ও হাওয়ার গুঞ্জন শুনতে চান।
ঘন ঝাউবনের ছায়া, নরম বালিয়াড়িতে লাল কাঁকড়াদের অবাধ আলপনা আর দিগন্ত বিস্তৃত রূপোলি জলরাশি—হরিপুর সী বিচ এক নিঃশব্দ স্বর্গের নাম।
হরিপুর সমুদ্র সৈকত কেন আলাদা?
দিঘা বা তাজপুরের বাণিজ্যিক চাকচিক্য হরিপুরে নেই। এখানে কোনো তারস্বরে চলা মাইক নেই, প্লাস্টিকের স্তূপ নেই, আর নেই কোনো কেনাকাটার হাঁকডাক। সকালের দিকে সমুদ্র এখানে বেশ শান্ত, আর ভাটার সময় জল অনেকটা পিছিয়ে গেলে বিশাল সৈকতটি যেন ক্যানভাসের রূপ নেয়। ঝাউ গাছের ফাঁক দিয়ে যখন ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ে বালিয়াড়িতে, হাজার হাজার লাল কাঁকড়া তাদের গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে লাল গালিচা বিছিয়ে দেয়।
সৈকতের ধারেই দাঁড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় জেলেদের কাঠের নৌকা। সকালে তাঁদের মাছ ধরে ফেরার দৃশ্য আর সমুদ্রের ওপর সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের রঙ বদল—ছবি তোলার অনুরাগী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
কিভাবে পৌঁছাবেন? (কলকাতা থেকে হরিপুর)
কলকাতা থেকে হরিপুরের দূরত্ব প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার। সপ্তাহান্তে দু-এক দিনের সংক্ষিপ্ত ছুটির জন্য এটি একটি আদর্শ গন্তব্য।
[কলকাতা/হাওড়া] ──► [কাঁথি / Kanthi] ──► [মজিলপুর/জুনপুট রোড] ──► [হরিপুর বিচ]
(ট্রেন/বাস) (টোটো/গাড়ি) (স্থানীয় পথ)
১. ট্রেনে যাত্রা:
- হাওড়া বা শালিমার স্টেশন থেকে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস, কান্ডারী এক্সপ্রেস বা দিঘা লোকাল ধরে সরাসরি পৌঁছান কাঁথি (Kanthi) বা কন্টাই স্টেশনে।
- ট্রেন ভেদে সময় লাগে ৩ থেকে ৩.৫ ঘণ্টা।
- কাঁথি স্টেশন থেকে হরিপুরের দূরত্ব প্রায় ১২-১৫ কিলোমিটার। স্টেশন থেকে রিজার্ভ অটো, টোটো বা ক্যাব নিয়ে শৌলা/জুনপুট রোড ধরে সরাসরি হরিপুর পৌঁছানো যায়।
২. সড়কপথে (বাস বা নিজস্ব গাড়ি):
- নিজস্ব গাড়ি: কোলাঘাট, নন্দকুমার হয়ে জাতীয় সড়ক ১৬ ও ১১৬বি (NH16 & NH116B) ধরে কাঁথি বাইপাস পৌঁছান। সেখান থেকে জুনপুট ও শৌলা রোডের দিকে ঢুকে মজিলপুর পঞ্চায়েতের অধীন হরিপুর গ্রামে যাওয়া যায়।
- বাসের মাধ্যমে: ধর্মতলা (Esplanade) বা সাঁতরাগাছি থেকে দিঘাগামী যেকোনো এসবিএসটিসি (SBSTC) বা প্রাইভেট এসি/নন-এসি বাসে উঠে কাঁথি বাইপাসে নামুন। সেখান থেকে লোকাল টোটো বা গাড়ি ভাড়া করে হরিপুর যান।
আরও পড়ুন :- পুজোয় ভিড় এড়িয়ে শান্তির খোঁজে ১০টি অপ্রচলিত ভ্রমণ গন্তব্য
থাকার সুযোগ-সুবিধা ও রিসোর্ট
পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুর সী বিচ (Haripur Sea Beach) ও এর আশেপাশের উপকূলীয় অঞ্চলে মূলত ইকো-রিসোর্ট, নেচার রিসোর্ট এবং হোমস্টে ধাঁচের বাসস্থান গড়ে উঠেছে। যেহেতু এটি একটি নির্জন ও অনাবিষ্কৃত গন্তব্য, তাই এখানে বিলাসবহুল ফাইভ-স্টার হোটেলের বদলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ছোঁয়াযুক্ত ইকো-কটেজ ও রিসোর্টই বেশি দেখা যায়।
- আবাসনের ব্যবস্থা: নিভৃত ও খোলামেলা পরিবেশে তৈরি কটেজ ও ইকো-রিসোর্ট রয়েছে। বেশির ভাগ রিসোর্টেই খাওয়ার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকে।
- খাবার-দাবার: তাজা সামুদ্রিক মাছ (পামফ্রেট, ইলিশ, গলদা চিংড়ি, পারশে) স্থানীয় মশলায় রেঁধে পরিবেশন করা হয়। সাধারণ বাঙালি থালির পাশাপাশি সান্ধ্যকালীন স্ন্যাক্সের বন্দোবস্ত থাকে।
- বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক: এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক এবং প্রধান প্রধান মোবাইল নেটওয়ার্কের ফোর-জি (4G) কভারেজ পাওয়া যায়।
এখানে হরিপুর এবং এর ঠিক লাগোয়া শৌলা, জুনপুট ও বগুড়ান জলপাই উপকূলের সেরা কিছু ইকো-রিসোর্ট ও হোমস্টের নাম এবং যোগাযোগের বিবরণ দেওয়া হলো:
১. জুনপুট ঝাউ রিসোর্ট / জুনপুট ইকো রিসোর্ট (Junput Jhau Resort)

হরিপুর ও জুনপুট উপকূলের সীমানা ঘেঁষে ঝাউবনের ছায়ায় অবস্থিত এই ইকো-রিসোর্টটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে আধুনিক স্বাচ্ছন্দ্যের মেলবন্ধন রয়েছে এখানে।
- বৈশিষ্ট্য: খোলামেলা বাগান, কাঠের কটেজ ব্যবস্থা, সুস্বাদু তাজা সামুদ্রিক মাছের খাবার ও গাইড সার্ভিস।
- অবস্থান: জুনপুট-হরিপুর কোস্টাল রোড।
- যোগাযোগ / বুকিং:
- ফোন: +91 9163428385
২. সাগর নিরালায় রিসোর্ট (Sagar Niralay, Baguran Jalpai)

হরিপুর সী বিচের ঠিক পাশেই অবস্থিত বগুড়ান জলপাই। নির্জনতা ও ইকো-ট্যুরিজমের জন্য এটি অত্যন্ত পরিচিত। ঝাউবনের গা ঘেঁষে থাকা এই রিসোর্টটি প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করার জন্য দারুণ।
- বৈশিষ্ট্য: এসি ও নন-এসি কটেজ, ইকো-গার্ডেন, সম্পূর্ণ ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি পরিবেশ ও স্থানীয় মাছের বাহারি থালি।
- অবস্থান: বগুড়ান জলপাই (হরিপুর বিচ থেকে মাত্র ৩-৪ কিমি দূরে)।
- যোগাযোগ / বুকিং:
- ফোন/হোয়াটসঅ্যাপ: +91 9434012200
৩. জুনপুট লাইফস্টাইল রিসোর্ট (Junput Lifestyle Resort)
হরিপুর ও জুনপুট উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবার বা বন্ধুদের দল নিয়ে থাকার জন্য এটি একটি বিশ্বস্ত ঠিকানা।
- বৈশিষ্ট্য: বড়ো খোলা প্রাঙ্গণ, এসি/নন-এসি ঘর, ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা ও স্থানীয় ঘোরার জন্য টোটো/গাড়ির ব্যবস্থা।
- অবস্থান: দক্ষিণ কাদূয়া, জুনপুট বাজার ও হরিপুর সংযোগকারী রাস্তা।
- যোগাযোগ / বুকিং:
- ফোন: +91 9434104617
৪. গোল্ডেন শাইন ঝিনুক রেসিডেন্সি (Golden Shine Jhinuk Residency / Local Homestays)
হরিপুর ও শৌলা উপকূলীয় গ্রামগুলোতে স্থানীয় অধিবাসীদের পরিচালিত বেশ কয়েকটি হোমস্টে ও ছোট ইকো-কটেজ রয়েছে।
- বৈশিষ্ট্য: একদম ঘরের মতো পরিবেশ, কম খরচে থাকা-খাওয়া এবং স্থানীয় জেলেপাড়া ও সৈকতের সহজ এক্সেস।
- অবস্থান: শৌলা-হরিপুর রোড, কাঁথি মহকুমা।
- যোগাযোগ: স্থানীয়ভাবে কাঁথি স্টেশন বা বাইপাস থেকে টোটো/ক্যাব চালকদের মাধ্যমে অথবা সরাসরি পৌঁছে অন-স্পট বুকিং করা যায়।
আরও পড়ুন – ঘুরে আসুন তাকদাহ: লুকানো সৌন্দর্য ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সন্ধানে
আনুমানিক খরচ (Cost Approximation)
হরিপুর ভ্রমণ অত্যন্ত পকেট-বান্ধব। দুই জন ব্যক্তির ২ দিন ১ রাতের আনুমানিক খরচের হিসেব নিচে দেওয়া হলো:
| খাতের বিবরণ | আনুমানিক ব্যয় (প্রতি জোড়া) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| যাতায়াত (ট্রেন + টোটো/ক্যাব) | ₹৬০০ – ₹১,২০০ | হাওড়া-কাঁথি ট্রেন ও কাঁথি থেকে হরিপুর টোটো ভাড়া |
| থাকা (১ রাত) | ₹১,২০০ – ₹২,৫০০ | এসি/নন-এসি কটেজ বা ডাবল বেড রুম |
| খাবার (২ দিন) | ₹১,০০০ – ₹১,৬০০ | প্রাতরাশ, দুপুরের মাছের থালি, স্ন্যাক্স ও নৈশভোজ |
| আনুষঙ্গিক খরচ | ₹৪০০ – ₹৬০০ | চা, ডাব ও স্থানীয় কেনাকাটা |
| মোট আনুমানিক খরচ | ₹৩,২০০ – ₹৫,৯০০ | পর্যটকের নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তনযোগ্য |
হরিপুর ভ্রমণের সেরা সময় ও আশেপাশের দ্রষ্টব্য
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ মাস হরিপুর ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। শীতকালের মিঠে রোদ আর সামুদ্রিক হাওয়ায় বেলাভূমিতে সময় কাটানো অত্যন্ত মনোরম।
- আশেপাশের দর্শনীয় স্থান:
- বগুড়ান জলপাই ও জুনপুট: হরিপুরের ঠিক পাশেই অবস্থিত আরও দুটি নীরব সৈকত।
- দারিয়াপুর লাইটহাউস: বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের পটভূমি এই স্থান, যেখান থেকে পুরো উপকূলের দৃশ্য চোখে পড়ে।
- ঝাঁপাবনি ও বাঁকিঝাঁপা: কাছেই থাকা মৎস্যজীবীদের গ্রাম ও ক্যানাল পয়েন্ট।
ভ্রমণকারীদের জন্য পরামর্শ (Guiding Tips)
- জোয়ার-ভাটার সময় সূচি জেনে নিন: ভাটার সময় সমুদ্রের জল অনেক দূরে চলে যায় এবং লাল কাঁকড়াদের মেলা বসে। জোয়ারের সময় সমুদ্র কাছে এলে ঝাউবনের ছায়ায় বসে সময় কাটানো নিরাপদ ও মনোরম।
- পূর্বে বুকিং নিশ্চিত করুন: থাকার জায়গার সংখ্যা সীমিত হওয়ায় সাপ্তাহিক ছুটি বা উৎসবের সময়ে যাওয়ার আগে রিসোর্ট বা হোমস্টে বুক করে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
- পরিবেশ সচেতন থাকুন: প্লাস্টিকের বোতল বা ময়লা সমুদ্রসৈকতে ফেলবেন না। এই কুমারী প্রকৃতিকে অক্ষত রাখা প্রতিটি সচেতন ভ্রমণকারীর দায়িত্ব।
- নগদ টাকা সাথে রাখুন: গ্রামে এটিএম (ATM) সুবিধা সীমিত হতে পারে, তাই প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সাথে রাখা ভালো।
নিস্তব্ধতা, প্রকৃতির বিশুদ্ধ রূপ আর সমুদ্রের স্নিগ্ধ ছোঁয়া—এই তিনে মিলে হরিপুর আপনার ক্লান্ত মনকে এক নিমেষে তাজা করে দেবে।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷


