পূর্ব ভারতের মৌসুমি বা বর্ষা উৎসবগুলির একটি বিশেষ ভ্রমণ গাইড

বর্ষা মানেই শুধু আকাশভাঙা বৃষ্টি আর কাদা-মাটির রাস্তা নয়। পূর্ব ভারতে বর্ষা মানে হলো জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা — উৎসবের আলোয়, ঢাকের বাদ্যে, আর মানুষের আনন্দের কলকাকলিতে ভরপুর একটা অনন্য ঋতু। আপনি যদি এই অঞ্চলের প্রাণের কাছে যেতে চান, তাহলে বর্ষাকালই সেরা সময়। পশ্চিমবঙ্গ, ওডিশা, ঝাড়খণ্ড, এবং আসামের মাটিতে এই সময় যে উৎসবগুলো জেগে ওঠে, সেগুলো একজন প্রকৃত ভ্রমণকারীর হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবেই।
চলুন, আপনাকে নিয়ে যাই সেই উৎসবের দেশে — বর্ষার পূর্ব ভারতে।
১. রথযাত্রা — পুরীর মহাউৎসব, ওডিশা

কখন যাবেন: জুন মাসের শেষ বা জুলাইয়ের শুরুতে (আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া)
পূর্ব ভারতের বর্ষা উৎসবের কথা বলতে গেলে সবার আগে আসে পুরীর রথযাত্রার নাম। ওডিশার পুরী শহরে এই উৎসব হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। প্রতি বছর লক্ষাধিক ভক্ত এবং পর্যটক এই মহাযজ্ঞের অংশ হতে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন।
কী দেখবেন ও কীভাবে উপভোগ করবেন:
জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার তিনটি বিশাল রথ — নন্দীঘোষ, তালধ্বজ ও দর্পদলন — হাজার হাজার ভক্তের হাতে টানা হয় মন্দির থেকে গুণ্ডিচা মন্দির পর্যন্ত। গ্র্যান্ড রোডের দুপাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখা আপনার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।
একটু আগে গিয়ে জায়গা দখল করুন, কারণ ভিড় অত্যন্ত বেশি হয়। পুরীর সমুদ্র সৈকতে সন্ধ্যার সময় হাঁটুন — বর্ষার মেঘলা আকাশে সূর্যাস্তের দৃশ্য অতুলনীয়। স্থানীয় ওডিয়া খাবার — মহাপ্রসাদ, পখাল ভাত, দালমা — অবশ্যই চেখে দেখুন।
বাস্তব পরামর্শ: রথযাত্রার সময় পুরীতে হোটেল পাওয়া কঠিন। অন্তত তিন মাস আগে থেকে বুকিং করুন। ভুবনেশ্বর থেকে পুরী মাত্র দুই ঘণ্টার পথ — সেখান থেকেও আসা-যাওয়া করা যায়।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন: কলকাতার হাওড়া বা শালিমার স্টেশন থেকে পুরী এক্সপ্রেস, জগন্নাথ এক্সপ্রেস বা দুরন্ত এক্সপ্রেসে সরাসরি পুরী পৌঁছানো যায় — সময় লাগে প্রায় ৮-৯ ঘণ্টা। বিমানে গেলে কলকাতা থেকে ভুবনেশ্বর (১ ঘণ্টা), সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সিতে পুরী (২ ঘণ্টা)।
আনুমানিক খরচ (২ রাত, ২ জনের জন্য): ট্রেন যাতায়াত স্লিপার শ্রেণিতে ৮০০–১,২০০ টাকা, থ্রি-এসিতে ২,০০০–২,৮০০ টাকা। হোটেল প্রতি রাত ৮০০–২,৫০০ টাকা (মিড-রেঞ্জ)। খাওয়া-দাওয়া ও ঘোরাঘুরিসহ দুজনের মোট আনুমানিক খরচ ৬,০০০–১২,০০০ টাকা।
২. অম্বুবাচী মেলা — কামাখ্যার রহস্যময় উৎসব, আসাম

কখন যাবেন: জুন মাসের মাঝামাঝি (আষাঢ় মাসের সপ্তম থেকে দশম দিন)
গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির — এটি শক্তিপীঠগুলির মধ্যে অন্যতম পবিত্র এবং রহস্যময়। প্রতি বছর বর্ষার শুরুতে এখানে পালিত হয় অম্বুবাচী মেলা। এই উৎসবের সঙ্গে জুড়ে আছে নারীত্ব ও প্রকৃতির এক গভীর দার্শনিক সংযোগ।
কী দেখবেন ও কীভাবে উপভোগ করবেন:
তিন দিন মন্দির বন্ধ থাকে, চতুর্থ দিনে পুনরায় খোলার সময় লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়। সারা ভারত থেকে তান্ত্রিক, সাধু-সন্ন্যাসী এবং ভক্তরা এই অম্বুবাচী মেলায় অংশ নেন। মেলার পরিবেশ অত্যন্ত আধ্যাত্মিক এবং জীবন্ত।
এই মেলায় ঘুরলে আপনি বুঝতে পারবেন পূর্ব ভারতের শাক্ত সংস্কৃতি কতটা গভীর ও বৈচিত্র্যময়। গুয়াহাটির কামাখ্যা মন্দির ছাড়াও আশেপাশে উমানন্দ দ্বীপ মন্দির ও ব্রহ্মপুত্র নদীতে নৌকাভ্রমণ করুন।
বাস্তব পরামর্শ: গুয়াহাটি বিমানবন্দর থেকে কামাখ্যা মন্দির মাত্র ২০-২৫ মিনিটের পথ। মেলার সময় ভিড় অত্যধিক হয় — ভোরবেলা দর্শনে গেলে তুলনামূলকভাবে কম ভিড় পাবেন।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে কামরূপ এক্সপ্রেস বা সরাইঘাট এক্সপ্রেসে গুয়াহাটি পৌঁছানো যায় — সময় লাগে প্রায় ১৭-১৯ ঘণ্টা। বিমানে গেলে কলকাতা থেকে গুয়াহাটি মাত্র ১ ঘণ্টা; সেখান থেকে অটো বা ট্যাক্সিতে কামাখ্যা মন্দির ২০ মিনিট।
আনুমানিক খরচ (২ রাত, ২ জনের জন্য): ট্রেন যাতায়াত স্লিপারে ১,২০০–১,৮০০ টাকা, থ্রি-এসিতে ৩,০০০–৪,০০০ টাকা। বিমানে (রিটার্ন) জনপ্রতি ৩,৫০০–৬,০০০ টাকা (আগাম বুকিংয়ে)। হোটেল প্রতি রাত ১,০০০–২,৫০০ টাকা। মোট আনুমানিক বাজেট (ট্রেনে) ৮,০০০–১৪,০০০ টাকা।
আরও পড়ুন :- ভারতের জনপ্রিয় উৎসব – বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির 14 টি
৩. শাওন-ভাদো উৎসব — ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী উৎসব

কখন যাবেন: জুলাই থেকে আগস্ট মাস জুড়ে
ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সংস্কৃতি পূর্ব ভারতের সবচেয়ে অমূল্য সম্পদগুলির একটি। বর্ষাকালে এখানকার সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাঁও সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিভিন্ন উৎসব পালন করেন যেগুলো প্রকৃতির সঙ্গে তাদের আত্মার বন্ধনকে প্রকাশ করে।
হারিয়ারি উৎসব: ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়ের সীমান্ত অঞ্চলে এই উৎসবে কৃষিযন্ত্রের পূজা করা হয়। সবুজে ঢাকা খেতের মধ্যে বাদ্য-সহকারে নাচ-গানের দৃশ্য দেখতে হলে এই সময়ই আসুন।
করম উৎসব: এই উৎসবে করম গাছের ডাল আনা হয় এবং রাতভর গান ও নৃত্যের আয়োজন করা হয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এই সুন্দর উদযাপন একজন ভ্রমণকারীর চোখে নতুন এক দিগন্ত খুলে দেবে।
ভাদু পরব: যদিও এটি প্রধানত রাঢ় বাংলা এবং সংলগ্ন ঝাড়খণ্ড এলাকায় (যেমন পুরুলিয়া, সিংভূম) ভাদ্র মাস জুড়ে পালিত হয়, তবে ঝাড়খণ্ডের বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে এটি বর্ষার এক জনপ্রিয় উৎসব। অবিবাহিত মেয়েরা ভাদু নামের একটি মাটির পুতুল সাজিয়ে গান ও নাচের মাধ্যমে এই উৎসব উদযাপন করে।
রাঁচি, জামশেদপুর বা পালামৌ থেকে এই আদিবাসী গ্রামগুলোতে ট্রিপ নিন। স্থানীয় গাইড নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে ভালো — এতে সংস্কৃতিকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ মেলে।
বাস্তব পরামর্শ: আদিবাসী উৎসবে ফটোগ্রাফি করার আগে অনুমতি নিন। সম্মানজনক আচরণ এবং স্থানীয় রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রাখুন। এটি কেবল ভ্রমণের শিষ্টাচার নয়, একজন সচেতন পর্যটকের দায়িত্ব।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে রাঁচি এক্সপ্রেস বা শতাব্দী এক্সপ্রেসে রাঁচি পৌঁছাতে সময় লাগে ৫-৬ ঘণ্টা। রাঁচি থেকে সড়কপথে বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে ১-৩ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছানো যায়। কলকাতা থেকে বাসেও জামশেদপুর যাওয়া সম্ভব (৩-৪ ঘণ্টা)।
আনুমানিক খরচ (২ রাত, ২ জনের জন্য): ট্রেন যাতায়াত ১,০০০–২,৫০০ টাকা। রাঁচিতে হোটেল প্রতি রাত ৮০০–২,০০০ টাকা। গ্রামে যাওয়ার গাড়ি ভাড়া ও স্থানীয় গাইড ৫০০–১,০০০ টাকা। মোট আনুমানিক বাজেট ৫,০০০–১০,০০০ টাকা।
আরও পড়ুন :- দূর্গাপূজায় কলকাতা ভ্রমণ: এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা
৪. বিশ্বকর্মা পূজা ও শিল্পী উৎসব — পশ্চিমবঙ্গ
কখন যাবেন: আগস্ট মাসের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শুরু (কন্যাসংক্রান্তি)
পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা পূজা কর্মজীবী মানুষের উৎসব। কারখানা, গ্যারেজ, ছাপাখানা, লৌহশিল্প প্রতিষ্ঠান — সর্বত্র এই দিনে যন্ত্রপাতির পূজা হয়। বর্ষার শেষলগ্নে হাওয়ায় পাটকাঠির ঘ্রাণ মিশিয়ে এই উৎসব পশ্চিমবঙ্গের শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে এক বিশেষ প্রাণ এনে দেয়।
হাওড়া, শিয়ালদহ, দুর্গাপুর, আসানসোল — এই শিল্পনগরীগুলোতে এই পূজার আনন্দ দেখতে পাবেন। পাশাপাশি ঘুড়ি ওড়ানো এই দিনের একটি বিশেষ আকর্ষণ — কলকাতার আকাশ ভরে যায় রঙিন ঘুড়িতে।
বাস্তব পরামর্শ: কলকাতার উত্তর ও মধ্য অংশের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরুন — ছোট্ট মণ্ডপে বিশ্বকর্মা পূজার আয়োজন দেখতে পাবেন যা মেগা-উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন: এই উৎসব মূলত কলকাতা ও তার শিল্পতালুকগুলিতেই পালিত হয় — হাওড়া, শ্যামনগর, দুর্গাপুর, আসানসোল। কলকাতা থেকে দুর্গাপুর ট্রেনে মাত্র ২ ঘণ্টা, আসানসোল ২.৫ ঘণ্টা। শহরের মধ্যে মেট্রো, বাস ও অটোতেই ঘোরাঘুরি করা যায়।
আনুমানিক খরচ (১ দিনের ট্রিপ, ২ জনের জন্য): কলকাতার মধ্যে ঘুরলে যাতায়াত খরচ মাত্র ২০০–৩০০ টাকা। দুর্গাপুর বা আসানসোল গেলে ট্রেন ভাড়া ও খাওয়াসহ মোট ১,০০০–২,০০০ টাকায় দিনের ট্রিপ সম্পন্ন করা যায় — এটি পূর্ব ভারতের সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎসব অভিজ্ঞতাগুলির একটি।
আরও পড়ুন :- পশ্চিমবঙ্গে 15টি জনপ্রিয় মেলা ও প্রদর্শনী কোথায়, কবে সব তথ্য
৫. নুয়াখাই — ওডিশার ফসলের উৎসব
কখন যাবেন: আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর (ভাদ্র মাসের শুক্লা পঞ্চমী)
পশ্চিম ওডিশায় নুয়াখাই হলো নতুন ফসলের উৎসব। এই অনুষ্ঠানে নতুন চাল দিয়ে তৈরি খাবার প্রথমে দেবতাকে নিবেদন করা হয়, তারপর পরিবারের সবাই একসঙ্গে আহার করেন।
সম্বলপুর, বালাঙ্গির, বরগড় — এই জেলাগুলোতে এই উৎসব খুব জমকালোভাবে নুয়াখাই পালিত হয়। সম্বলপুরি লোকসংগীত ও নৃত্য এই উৎসবের প্রাণ। ডোকরা ধাতুশিল্প ও সম্বলপুরি শাড়ি এই অঞ্চলের বিশেষ কেনাকাটার উপকরণ।
বাস্তব পরামর্শ: সম্বলপুর যাওয়ার জন্য ভুবনেশ্বর বা রায়পুর থেকে সরাসরি ট্রেন ও বাস পাওয়া যায়। উৎসবের দিন স্থানীয় পরিবারের আতিথেয়তা গ্রহণের সুযোগ পেলে ছাড়বেন না — এটি আপনার ভ্রমণকে অবিস্মরণীয় করে তুলবে।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে হীরাকুড় এক্সপ্রেস বা সম্বলপুর রোড এক্সপ্রেসে সরাসরি সম্বলপুর পৌঁছানো যায় — সময় লাগে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা (রাতের ট্রেনে গেলে ভোরবেলা পৌঁছানো যায়)। বিকল্পে ভুবনেশ্বর পর্যন্ত বিমানে গিয়ে সেখান থেকে ট্রেন বা বাসে সম্বলপুর।
আনুমানিক খরচ (২ রাত, ২ জনের জন্য): ট্রেন যাতায়াত স্লিপারে ১,০০০–১,৫০০ টাকা, থ্রি-এসিতে ২,৫০০–৩,৫০০ টাকা। হোটেল প্রতি রাত ৭০০–১,৮০০ টাকা। স্থানীয় খাওয়া-দাওয়া ও কেনাকাটাসহ মোট বাজেট ৭,০০০–১৩,০০০ টাকা।
৬. বিহু ও বন্যার উৎসব — আসামের সবুজ উপত্যকায়

কখন যাবেন: জুলাই থেকে আগস্ট
আসামে বর্ষাকাল মানে ব্রহ্মপুত্রের বিশাল জলরাশি, সবুজ চা-বাগান, আর মাজুলির মতো নদীদ্বীপের অপার্থিব সৌন্দর্য। যদিও কাটি বিহু (অক্টোবরে) এবং বোহাগ বিহু (এপ্রিলে) বেশি পরিচিত, বর্ষায় আসামের লোকসংস্কৃতি নানা আঞ্চলিক উৎসবে মুখর থাকে।
মাজুলি দ্বীপ: পৃথিবীর বৃহত্তম নদীদ্বীপ — বর্ষায় এখানে প্রকৃতি পুরোদমে জেগে ওঠে। নামঘর (বৈষ্ণব প্রার্থনা কেন্দ্র)-এ সন্ধ্যার প্রার্থনায় অংশ নিন। হস্তশিল্পীদের কাজ দেখুন — মুখোশ তৈরি, বাঁশের কাজ।
কাজিরাঙা: বর্ষায় কাজিরাঙায় পর্যটন বন্ধ থাকলেও এর আশেপাশের অঞ্চলে প্রকৃতির অপূর্ব রূপ দেখা যায়। নেহেরু উদ্যান বা পোবিতোরা অভয়ারণ্যে গেলে গণ্ডারের দেখা মিলতে পারে।
বাস্তব পরামর্শ: মাজুলি যেতে হলে জোরহাট থেকে ফেরি নিতে হয়। বর্ষায় নদীর স্রোত বেশি থাকে — ফেরির সময়সূচি আগে থেকে জেনে নিন।
কলকাতা থেকে কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে গুয়াহাটি ট্রেনে (১৭-১৯ ঘণ্টা) বা বিমানে (১ ঘণ্টা)। গুয়াহাটি থেকে জোরহাট ট্রেনে আরও ৪-৫ ঘণ্টা বা বাসে ৫-৬ ঘণ্টা। জোরহাট থেকে ফেরিতে মাজুলি দ্বীপ ১-১.৫ ঘণ্টা। বিমানে কলকাতা থেকে সরাসরি জোরহাটেও ফ্লাইট পাওয়া যায় (১.৫ ঘণ্টা)।
আনুমানিক খরচ (৩ রাত, ২ জনের জন্য): ট্রেনে কলকাতা-গুয়াহাটি-জোরহাট যাতায়াত থ্রি-এসিতে ৪,০০০–৬,০০০ টাকা। বিমানে (কলকাতা-জোরহাট রিটার্ন) জনপ্রতি ৫,০০০–৯,০০০ টাকা। মাজুলিতে হোমস্টে প্রতি রাত ৬০০–১,৫০০ টাকা। মোট আনুমানিক বাজেট ১২,০০০–২২,০০০ টাকা।
বর্ষার পূর্ব ভারতে ভ্রমণের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় টিপস
পোশাক ও সরঞ্জাম
বর্ষায় পূর্ব ভারতে ঘোরার জন্য হালকা, দ্রুত শুকানো যায় এমন পোশাক নিন। ভালো মানের রেইনকোট বা পন্টো অপরিহার্য। ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ বা ব্যাগ কভার নিতে ভুলবেন না। মোবাইল ও ক্যামেরার জন্য আলাদা ওয়াটারপ্রুফ পাউচ রাখুন।
স্বাস্থ্য সতর্কতা
বর্ষায় ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে — মশানিরোধক ক্রিম বা স্প্রে সঙ্গে রাখুন। রাস্তার খাবার সাবধানে খান; বিশুদ্ধ জল পান করুন। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও একটি ছোট ফার্স্ট এইড কিট সঙ্গে থাকা ভালো।
যাতায়াত পরিকল্পনা
বর্ষায় পার্বত্য ও বনাঞ্চলের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যাত্রার আগে রাস্তার অবস্থা সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য নিন। ট্রেন ভ্রমণ এই মৌসুমে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা
মন্দির ও পূজামণ্ডপে ঢোকার আগে জুতো খুলুন। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশুন — এতেই পাবেন সত্যিকারের ভ্রমণের আনন্দ।
বর্ষার পূর্ব ভারত কেন অনন্য?
অনেকেই বর্ষাকালকে ভ্রমণের জন্য “অনুপযুক্ত” বলে মনে করেন। কিন্তু পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বর্ষাই এখানকার সত্যিকারের প্রাণ — মাটির গন্ধ, সবুজের সমারোহ, নদীর পূর্ণযৌবন, আর উৎসবের উত্তাপ মিলিয়ে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, তা অন্য কোনো মৌসুমে পাওয়া সম্ভব নয়।
পুরীর রথের চাকার ঘর্ঘর, কামাখ্যার মন্দিরের ঘণ্টার আওয়াজ, ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী নৃত্যের তাল, আসামের চা-বাগানের সবুজ — এগুলো কেবল দৃশ্য বা শব্দ নয়, এগুলো একটা সভ্যতার স্পন্দন।
একজন সচেতন ভ্রমণকারী হিসেবে আপনি যখন এই উৎসবগুলোর অংশ হন, তখন কেবল একটি স্থান দেখেন না — একটি সংস্কৃতিকে অনুভব করেন। আর সেই অনুভবই তো আসল ভ্রমণের অর্থ।
তাহলে আর দেরি কেন? গুছিয়ে নিন আপনার ব্যাগ, পরে নিন রেইনকোট, আর বেরিয়ে পড়ুন বর্ষার পূর্ব ভারতের সেই উৎসবমুখর পথে — যেখানে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন এক নতুন গল্প বলে।
এই ব্লগটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার ভ্রমণপ্রেমী বন্ধুদের সঙ্গে। পূর্ব ভারতের অন্যান্য লুকানো গন্তব্য সম্পর্কে জানতে আমাদের সঙ্গেই থাকুন।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷

