কলকাতা থেকে দিঘা, পুরী এবং দার্জিলিং কীভাবে যাবেন? জানুন হাওড়া ও শিয়ালদহ থেকে সেরা ট্রেনের সময়সূচি, বাস সার্ভিস, রুট ২০২৬-এর ভাড়া তালিকা।

কলকাতার কর্মব্যস্ত জীবন থেকে একটু ছুটি পেলেই বাঙালির মন কোথাও একটা ঘুরে আসার জন্য ছটফট করে ওঠে। আর ভ্রমণের কথা ভাবলেই আমাদের মাথায় মূলত তিনটি জায়গার নাম সবার আগে আসে— উইকেন্ডের চটজলদি সমুদ্রস্নান ও ইলিশের স্বাদ পেতে দিঘা, জগন্নাথ দেবের দর্শন আর অন্তহীন বেলাভূমির টানে পুরী, আর কাঞ্চনজঙ্ঘার কোল ঘেঁষে মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুরি দেখতে উত্তরবঙ্গের রানি দার্জিলিং।
কিন্তু বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করার সময় সবথেকে বড় প্রশ্নটা আসে যাতায়াত নিয়ে। “যাব কীভাবে? ট্রেন নাকি বাস? কোনটার টাইমিং ভালো? বর্তমান ভাড়া কত?”
আজকের এই কমপ্লিট ট্রাভেল গাইডে আমরা আলোচনা করব কলকাতা থেকে দিঘা, পুরী এবং দার্জিলিং যাওয়ার সমস্ত ট্রেন এবং বাস সার্ভিসের খুঁটিনাতি তথ্য ও ২০২৬ সালের বর্তমান আনুমানিক ভাড়া (approx current fare) নিয়ে।
১. কলকাতা থেকে দিঘা ভ্রমণ নির্দেশিকা (Kolkata to Digha Travel Guide)
কলকাতা থেকে দিঘার দূরত্ব মাত্র ১৮৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি। শুক্রবার অফিস সেরে বা শনিবার ভোরে বেরিয়ে রবিবার রাতের মধ্যে ঘুরে আসার জন্য দিঘার কোনো বিকল্প নেই।
ক) কলকাতা থেকে দিঘা ট্রেন পরিষেবা এবং সময়সূচি
কলকাতা (হাওড়া ও শালিমার) থেকে দিঘা যাওয়ার জন্য প্রতিদিন নিয়মিত সুপারফাস্ট এবং এক্সপ্রেস ট্রেন চলে। মাত্র ৩ থেকে ৩.৫ ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন সমুদ্রের পাড়ে।
প্রধান ট্রেনগুলির সময়সূচি ও আনুমানিক ভাড়া তালিকা:
| ট্রেনের নাম ও নম্বর | ছাড়ার স্টেশন ও সময় | পৌঁছানোর সময় | চলাচল করার দিন | আনুমানিক ভাড়া (টাকায়) |
|---|---|---|---|---|
| তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস (12857) | হাওড়া (HWH) – সকাল ০৬:৪৫ | দিঘা (DGHA) – সকাল ১০:০৫ | প্রতিদিন | 2S: ₹১১০ |
| কান্ডারী এক্সপ্রেস (22897) | হাওড়া (HWH) – বিকেল ০৩:০০ | দিঘা (DGHA) – সন্ধে ০৬:২০ | প্রতিদিন | 2S: ₹১১০ |
| দিঘা সুপারফাস্ট এসি এক্সপ্রেস (22863) | হাওড়া (HWH) – সকাল ১১:১০ | দিঘা (DGHA) – দুপুর ০২:২০ | প্রতিদিন | CC: ₹৫২০ |
প্রো-টিপ: আপনি যদি দিঘায় গিয়ে পুরো দিনটা কাজে লাগাতে চান, তবে সকালের তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস সবচেয়ে সেরা অপশন। সাধারণ সিটিং ক্লাসের (2S) ভাড়া মাত্র ১১০ টাকা এবং এসি চেয়ার কার (CC) ৩৯০ টাকা।
খ) কলকাতা টু দিঘা বাস সার্ভিস (Kolkata to Digha Bus Service)
আপনার যদি ট্রেনের টিকিট না মেলে বা হুট করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে বাসই আপনার একমাত্র ভরসা। কলকাতা থেকে দিঘার রুটে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রতিদিন প্রচুর বাস চলে।
- সরকারি বাস (SBSTC & WBTC): ধর্মতলা (Esplanade), করুণাময়ী (Salt Lake), হাওড়া এবং ডানলপ থেকে ভোর ৪টে থেকে বাস পাওয়া যায়। সাধারণ নন-এসি বাসের ভাড়া শুরু হয় মাত্র ₹১৩০ – ₹২০০ থেকে।
- বেসরকারি লাক্সারি বাস: গ্রিনলাইন (Greenline), রয়্যাল ক্রুজার (Royal Cruiser) এবং শ্যামলী পরিবাহন এই রুটে ভলভো এসি (Volvo AC) ও স্লিপার বাস চালায়।
- ভাড়া ও সময়: বাসে যেতে সাধারণত ৪.৫ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে। লাক্সারি ভলভো বা এসি স্লিপার বাসের বর্তমান ভাড়া সাধারণত ₹৫০০ থেকে ₹৮০০-র মধ্যে।
আরও পড়ুন :- কলকাতা থেকে বাইক ভ্রমণ, সেরা 10 টি গন্তব্য ৬৫ থেকে ৬৫০ কিমি
২. কলকাতা থেকে পুরী ভ্রমণ গাইড (Kolkata to Puri Travel Guide)
উড়িষ্যার পুরী বাঙালির অত্যন্ত আবেগ জড়ানো একটি তীর্থক্ষেত্র ও পর্যটন কেন্দ্র। প্রায় ৫০০ কিলোমিটারের এই যাত্রাপথটি রাতারাতি বা বিকেলের ট্রেনে চমৎকারভাবে পার করা যায়।
ক) কলকাতা থেকে পুরী ট্রেন সার্ভিস
কলকাতা থেকে পুরী যাওয়ার ট্রেন জার্নি ভীষণ আরামদায়ক। রাতের ট্রেনে ঘুমিয়ে পরদিন ভোরে পুরী পৌঁছানো অথবা বন্দে ভারত ও শতাব্দী এক্সপ্রেসে দিনের বেলা দ্রুত পৌঁছে যাওয়া— সবকটি বিকল্পই দারুণ।
প্রধান ট্রেনগুলির সময়সূচি ও বর্তমান ভাড়া:
| ট্রেনের নাম ও নম্বর | ছাড়ার স্টেশন ও সময় | পৌঁছানোর সময় | চলাচল করার দিন | আনুমানিক ভাড়া (টাকায়) |
|---|---|---|---|---|
| হাওড়া-পুরী বন্দে ভারত এক্সপ্রেস (22895) | হাওড়া – সকাল ০৬:১০ | পুরী – দুপুর ১২:৫০ | বুধ বাদে প্রতিদিন | CC: ₹১,৪৮৫ |
| হাওড়া-পুরী শতাব্দী এক্সপ্রেস (12277) | হাওড়া – দুপুর ০২:২৫ | পুরী – রাত ১০:০৫ | প্রতিদিন | CC: ₹১,৪১০ |
| জগন্নাথ এক্সপ্রেস (18409) | শালিমার (SHM) – রাত ০৭:০৫ | পুরী – ভোর ০৪:৩০ | প্রতিদিন | SL: ₹৩১০ |
| হাওড়া পুরী এক্সপ্রেস (12837) | হাওড়া – রাত ১০:৪০ | পুরী – সকাল ০৭:১৫ | প্রতিদিন | SL: ₹৩৫৫ |
পরামর্শ: পরিবার বা বয়স্ক মানুষদের সাথে নিয়ে ভ্রমণের জন্য হাওড়া পুরী এক্সপ্রেস (12837) অথবা জগন্নাথ এক্সপ্রেস সবচেয়ে আরামদায়ক। স্লিপার ক্লাসের (SL) ভাড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে এবং থার্ড এসি (3A) ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার কাছাকাছি।
খ) কলকাতা থেকে পুরী বাস সার্ভিস
ট্রেনের টিকিট না পাওয়া গেলে কলকাতা-পুরী রুটের মাল্টি-অ্যাক্সেল ভলভো স্লিপার বাসগুলি একটি দুর্দান্ত বিকল্প হতে পারে।
- বোর্ডিং পয়েন্ট: বাসগুলি সাধারণত কলকাতার বাবুঘাট বা ধর্মতলা থেকে ছাড়ে।
- টাইমিং ও ভাড়া: বেশিরভাগ কলকাতা থেকে পুরী বাস সার্ভিস রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে কলকাতা ছাড়ে এবং পরের দিন সকাল ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে পুরী পৌঁছায়। ওআরএসটিসি (OSRTC), শ্যামলী ও রয়্যাল ক্রুজারের মতো এসি স্লিপার বাসের বর্তমান ভাড়া সাধারণত ₹৮০০ থেকে ₹১,৩০০-র মধ্যে হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন – কলকাতা ডে ট্যুর একটি আদর্শ গ্রীষ্মকালে কলকাতা শহর ভ্রমণ গাইড
৩. কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাওয়ার উপায় (Kolkata to Darjeeling Route Guide)

কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথটি দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথমে আপনাকে ট্রেন বা বাসে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি (NJP) পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে পাহাড়ি রাস্তায় দার্জিলিং পৌঁছাতে হবে।
ভাগ ১: কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি (Kolkata to NJP)
ট্রেন পরিষেবা: উত্তরবঙ্গের লাইফলাইন
শিলিগুড়ি বা এনজেপি যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে একাধিক আইকনিক ট্রেন রয়েছে। পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রাতের ট্রেনই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।
প্রধান ট্রেনগুলির সময়সূচি ও আনুমানিক ভাড়া:
| ট্রেনের নাম ও নম্বর | ছাড়ার স্টেশন ও সময় | পৌঁছানোর সময় (NJP) | চলাচল করার দিন | আনুমানিক ভাড়া (টাকায়) |
|---|---|---|---|---|
| দার্জিলিং মেল (12343) | শিয়ালদহ (SDAH) – রাত ১০:০৫ | এনজেপি (NJP) – সকাল ০৮:১৫ | প্রতিদিন | SL: ₹৩৮৫ |
| পদাতিক এক্সপ্রেস (12377) | শিয়ালদহ (SDAH) – রাত ১১:২০ | এনজেপি (NJP) – সকাল ০৯:১৫ | প্রতিদিন | SL: ₹৩৮৫ |
| এনজেপি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস (22301) | হাওড়া (HWH) – সকাল ০৫:৫৫ | এনজেপি (NJP) – দুপুর ০১:২৫ | বুধ বাদে প্রতিদিন | CC: ₹১,৫৬৫ |
পরামর্শ: সময় বাঁচাতে চাইলে এবং দিনের দিন পাহাড়ে পৌঁছাতে চাইলে মাত্র সাড়ে সাত ঘণ্টার এনজেপি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস বেছে নিতে পারেন (ভাড়া প্রায় ₹১,৫৬৫)। আর ঐতিহ্যবাহী জার্নির জন্য দার্জিলিং মেল অলটাইম বেস্ট।
বাস পরিষেবা: কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি
কলকাতার ধর্মতলা এবং সল্টলেক করুণাময়ী থেকে শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাস পর্যন্ত প্রচুর লাক্সারি এসি স্লিপার বাস চলে।
- অপারেটর ও ভাড়া: NBSTC সরকারি বাস ছাড়াও গ্রিনলাইন, শ্যামলী ও রয়্যাল ক্রুজার এই রুটে বাস চালায়। বাসগুলি সাধারণত সন্ধ্যা ৫টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে রওনা দেয়। নন-এসি বাসের ভাড়া ₹৬০০ থেকে শুরু এবং প্রিমিয়াম এসি স্লিপার বাসের ভাড়া ₹১,০০০ থেকে ₹১,৬০০ পর্যন্ত হয়।
ভাগ ২: শিলিগুড়ি/এনজেপি থেকে দার্জিলিং (NJP to Darjeeling)
এনজেপি স্টেশন বা শিলিগুড়ি বাস টার্মিনালে নামার পর দার্জিলিং পাহাড়ে যাওয়ার ৩টি মাধ্যম রয়েছে:
১. শেয়ার্ড বা প্রাইভেট ট্যাক্সি (NJP to Darjeeling Car Fare)
- শেয়ার্ড ট্যাক্সি (Shared Taxi): এনজেপি বা শিলিগুড়ি জংশন থেকে শেয়ার্ড সুমো বা বোলেরো পেয়ে যাবেন। প্রতি সিটের বর্তমান ভাড়া ₹৩৫০ থেকে ₹৪০ টাকা।
- প্রাইভেট গাড়ি (Private Car Booking): ছোট গাড়ির ক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে প্রায় ₹৩,০০০ – ₹৩,৫০০ এবং ইনোভা/ক্রিস্টা গাড়ির ক্ষেত্রে ভাড়া ₹৪,৫০০ থেকে ₹৫,৫০০ বা তার বেশি হতে পারে (ট্যুরিস্ট সিজনে ভাড়া কিছুটা বৃদ্ধি পায়)।
২. সরকারি বাস (NBSTC Bus to Darjeeling)
সবচেয়ে সস্তায় পাহাড়ে উঠতে চাইলে শিলিগুড়ি তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যান্ড থেকে সকালের দিকে দার্জিলিং যাওয়ার সরকারি বাস ধরুন। এর বর্তমান ভাড়া মাত্র ₹১৫০ থেকে ₹২৫० টাকার মধ্যে।
৩. দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (Toy Train Journey)
যদি আপনি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের (UNESCO World Heritage) সাক্ষী হতে চান, তবে এনজেপি থেকে সরাসরি দার্জিলিং যাওয়ার টয় ট্রেনটি (52541 NJP – DJ Passenger) বুক করতে পারেন। এর এসি ও ফার্স্ট ক্লাস ভেদে ভাড়া সাধারণত ₹১,২০০ থেকে ₹১,৫০০ টাকার কাছাকাছি। (নোট: এই যাত্রাটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগে)।
জরুরি ট্রাভেল টিপস (Travel Tips for Tourists)
১. অগ্রিম বুকিং: দিঘা, পুরী বা নিউ জলপাইগুড়ির ট্রেনের টিকিট উইকেন্ড এবং ছুটির মরশুমে (যেমন পুজো বা গরমের ছুটি) পেতে হলে IRCTC-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে অন্তত ২-৩ মাস আগে টিকিট কেটে রাখুন।
২. অনলাইন বাস বুকিং: শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়াতে RedBus বা সরকারি পরিবহনের নিজস্ব পোর্টাল থেকে আগেভাগেই বাসের সিট বুক করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
৩. পাহাড়ি রাস্তার সতর্কতা: শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার আঁকাবাঁকা পাহাড়ে অনেকেরই মোশন সিকনেস বা বমির সমস্যা হয়। তাই সাথে প্রয়োজনীয় ওষুধ রাখুন এবং পাহাড়ে ওঠার মুখে হালকা খাবার খান।
আপনার আগামী ভ্রমণ আনন্দময়, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ হোক! আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে Comment করে আমাদের জানাতে পারেন।
(Disclaimer: উল্লেখিত ট্রেন ও বাসের ভাড়া এবং সময়সূচি পরিবর্তনশীল। যাত্রার পূর্বে অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আরও একবার ভেরিফাই করে নেওয়ার অনুরোধ রইল।)

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷
