
উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কলকাতার উত্তর এবং উত্তর পূর্ব দিকে অবস্থিত। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনবহুল জেলা। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় অসংখ্য জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য রয়েছে যা এই রাজ্যের শীর্ষ পর্যটক স্থল। কলকাতার কাছাকাছি হওয়ায় এই জেলার গন্তব্যগুলি কলকাতা থেকে যেকোন একটি বা দুটি গন্তব্য একই দিনে ঘুরে আসতে পারবেন আবার অনেক জায়গাতে রাত্রিবাসের সুব্যবস্থাও আছে (যেমন ব্যারাকপুর, দক্ষিণেশ্বর, টাকি বা গোবরডাঙ্গা ) ।
পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফর বাংলার নবাব হলে তিনি আমিরপুর, আকবরপুর, আজিমাবাদের মত চব্বিশটি পরগনার জমিদারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যৌতুক হিসেবে দেন, তখন থেকেই জায়গাটিকে ২৪ পরগনা নামে পরিচিত। পরে ১৯৮৬ থেকে আবার উত্তর ও দক্ষিন ২৪ পরগনা নামে বিভক্ত হয়।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার দর্শনীয় স্থান – সেরা ৭টি পর্যটক গন্তব্য
আমরা এখানে উত্তর ২৪ পরগানা জেলার সেরা ৭টি বেড়াবার জায়গায় কি কি দেখার আছে, বা কিভাবে সেখানে যাবেন তার একটা পুর্নাঙ্গ তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করব।
১. দক্ষিণেশ্বর মন্দির

দক্ষিণেশ্বর মন্দির কেবল উত্তর ২৪ পরগনা নয় সারা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য । দক্ষিণেশ্বর মন্দির উত্তর ২৪ পরগনার জেলার প্রসিদ্ধ পর্যটন স্থান হবার কারন তার ইতিহাস। গদাধর চট্টোপাধ্যায় এই মন্দিরেই হয়ে ওঠেন যুগাবতার শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর স্বামী বিবেকানন্দ এই গঙ্গার অপর তীরেই বেলুড়ে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন।
কলকাতা শহরের উপকন্ঠ তথা উত্তর ২৪ পরগনার জেলার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ স্থান ও মন্দির বলা যায় এই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরকে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর ভ্রমণকারী ও শ্রদ্ধালু ভক্তরা এই মন্দিরে আসেন।
কথিত আছে রানী রাসমণি অন্নপূর্ণা পূজোর জন্যে কাশীতে তীর্থযাত্রার আয়োজন কালে দেবী মা কালীর স্বপ্নাদেশ পান। এবং ১৮৫৫ সালে গঙ্গা নদীর পূর্ব তীরে এই দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির বঙ্গীয় স্থাপত্য-শৈলীর নবরত্ন স্থাপত্য ধারা অনুযায়ী তিন তলা দক্ষিণমুখী এই মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়। মা কালী এখানে মা ভবতারিনী নামে এই মন্দিরে পূজিতা হন। মন্দিরটি উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার কামারহাটিতে অবস্থিত। মন্দিরটি থেকেই জায়গাটির নাম হয়ে গেছে দক্ষিণেশ্বর।
কিভাবে যাবেন দক্ষিণেশ্বর
দক্ষিণেশ্বরে আসা খুবই সহজ আপনি কলকাতার দিক থেকে আসতে চাইলে ট্রেন, বাস মেট্রো যেকোনো একটিকেই বেছে নিতে পারেন, মেট্রো চালু হয়ে যাওয়ায় এখন আরো সুবিধা হয়ে গেছে।
- ট্রেনে – শিয়ালদহ থেকে ডানকুনি লোকালে একেবারে দক্ষিণেশ্বরে স্টেশনে নামুন।
- বাসে – ধর্মতলা থেকে সরাসরি দক্ষিণেশ্বর প্রচুর বাস ও মিনিবাস রয়েছে। তা ছাড়াও এয়ারপোর্ট – ডানকুনি রুটের প্রচুর বাস ইচ্ছেমত নিতে পারেন।
- নিজস্ব গাড়িতে কলকাতা বা হাওড়ার যেকোন জায়গা থেকে বিবেকানন্দ সেতু বা নিবেদিতা সেতু আসলেই আপনি দক্ষিণেশ্বর পৌঁছুলেন।
তাছাড়া এখন দক্ষিণেশ্বর করিডোর বা স্কাইওয়াক চালু হয়ে যাওয়ায় আপনি ট্রেন, মেট্রো বা বাস থেকে নেমে সোজা এই স্কাইওয়াকের মাধ্যমেই কোনো ঝোর ঝামেলা ছাড়াই মন্দির পৌঁছে যেতে পারবেন।
২. ধান্যকুড়িয়া

ধান্যকুড়িয়া গ্রামটি উত্তর ২৪ পরগনার দুটি শহর বারাসত ও বসিরহাটের মাঝামাঝি অবস্থিত। টাকি রোডের উপর মাটিয়া থানার অন্তর্গত ছোট্ট কিন্তু বর্ধিষ্ণু একটি গ্রাম। ধান্যকুড়িয়া কে অনেকে আবার “দ্য ভিলেজ অফ্ ক্যাসেল” বলেও ডাকেন। এই বর্ধিষ্ণু অঞ্চলে তিনটে বড় মাপের জমিদারবাড়ি ছাড়াও আছে তাদের অনেকগুলি বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির, স্কুল এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য টাকি রোডের ধারে গায়েন গার্ডেন।

টাকি রোড থেকে গ্রামে ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে ‘গাইন গার্ডেন’ একেবারে পাক্কা ইউরোপিয়ান স্থাপত্যে তৈরি । গায়েন জমিদারদের নিজস্ব বাগানবাড়ি ছিল এটি। স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে এটি সরকার অধিগ্রহন করে এটিকে একটি অনাথ আশ্রম হিসাবে চালাত। এখন এটিকে হেরিটেজ কমিশন থেকে সংস্কার করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তাই আপনি বর্তমানে ভিতরে প্রবেশ করতে না পারলেও এই গায়েন গার্ডেনের ইউরোপীয় আদলে তৈরি গেটটি দেখে আপনি সত্যি অবাক হয়ে যাবেন।
গায়েন গার্ডেন পেরিয়ে ধান্যকুড়িয়া গ্রামের মধ্যে কয়েক মিনিট হাঁটলেই আপনার চোখে পড়বে ধান্যকুড়িয়া হাই স্কুল, যেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৮৫ সালে, বসিরহাট মহকুমা এলাকার প্রাচীনতম স্কুলের মধ্যে অন্যতম। সাম্প্রতিক কালে হেরিটেজ ঘোষিত হয়েছে ধান্যকুড়িয়া হাই স্কুল।
এই ধান্যকুড়িয়াতে আসলে তিনটি বিশাল জমিদারবাড়ি দেখতে পাবেন, যা ছোট্ট একটি গ্রামের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। জমিদারবাড়ি গুলো হলো –
- গায়েনবাড়ি বা গায়েন ম্যানসন। প্রতিষ্ঠাতা মহেন্দ্র নাথ গায়েন।
- বল্লভ বাড়ি বা বল্লভ ম্যানসন। প্রতিষ্ঠাতা শ্যাম বল্লভ।
- সাউবাড়ি বা সাউ ম্যানসন। প্রতিষ্ঠাতা পতিত চন্দ্র সাউ।

এখানে সাউ, বল্লভ বা গায়েন বাড়ি ছাড়াও প্রত্যেকের জমিদার বাড়ীর আলাদা মন্দির, বাগানবাড়ি, নহবতখানা ইত্যাদি এখনও দাঁড়িয়ে আছে যেগুলিও স্থাপত্য আপনাকে ভাবাবে কলকাতা থেকে এতটা দূরে একটা গ্রামে শতবর্ষের আগে এরকম স্থাপত্য ।
এখানে দুর্গা পূজা খুবই ধুম ধামের সঙ্গে পালন করা হয়, তাই এখানে আসতে চাইলে অবশ্যই দুর্গা পূজার সময়ে আসবেন খুবই ভালো লাগবে। অন্য সময় আসলে জমিদার বাড়ি গুলোর ভিতরে প্রবেশ করতে অনেক অনুমতির দরকার হতে পারে ভিতরে ঢোকার।
কিভাবে যাবেন ধান্যকুড়িয়া
এখানে আসা খুবই সহজ আপনি টাকি বা বসিরহাট যাওয়ার পথেই এই জায়গাটি দেখে নিতে পারেন বারাসত- বসিরহাট রোড বা টাকি রোড একদম পাশেই এই গ্রাম ধান্যকুড়িয়া।
- বাসে আসতে চাইলে কলকাতার ধর্মতলা থেকে সরকারি ও বেসরকারি যেকোন বসিরহাট বা হাসনাবাদ যাবার বাসে উঠুন আর ধান্যকুড়িয়া স্টপে নেমে পড়ুন। যেতে সময় দু থেকে আড়াই ঘন্টা লাগবে।
- ট্রেনে আসতে চাইলে নিকটবর্তী স্টেশন হলো কাঁকড়া – মির্জানগর বা মালতিপুর স্টেশন। আমাকে শিয়ালদা স্টেশন থেকে হাসনাবাদ লোকাল ধরে এই স্টেশন গুলোতে নামতে হবে।
এখানে বেড়াবার টিপস
এখনও বেড়াবার জন্য পরিকাঠামো, যেমন থাকার জায়গা ( কোথাও চোখে পড়েনি ) বা একটু ভাল খাবার হোটেল গড়ে ওঠেনি। তাই গ্রামের ভিতরে ঘোরার জন্য সবথেকে ভাল হয় যদি নিজস্ব গাড়ি থাকে। গ্রামের মধ্যেও রাস্তা ভাল। খাবার কিছু অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে নেবেন। সর্বোপরি আপনার মন ভরিয়ে দেবে গ্রামের মন্দির বা ভবন গুলির স্থাপত্য যেগুলি দেখুন আর ছবি তুলুন।
৩. টাকি

কলকাতার কাছেই উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ইচ্ছামতি নদীতে ঘেরা একটি জনপ্রিয় বেড়াবার জায়গা। এক বা দুদিনের ঘোরার জন্য টাকি কিন্তু একদম আদর্শ । বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তে নৌকা ভ্রমণ বর্তমানে প্রচুর পর্যটক আকর্ষন করছে। তবে সবথেকে বেশি পর্যটক সমাগম হয় দূর্গাপূজার বিসর্জনের দিন যখন বর্ডারের দুই প্রান্ত থেকেই মানুষজন নদীতীরে একত্রিত হয় নদীবক্ষে বিসর্জন দেখার জন্য। আসলে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাসনাবাদ থানার অন্তর্গত টাকি একটি খুবই সাজানো গোছানো, ছোট্টো একটি শহর।
নিচে কয়েকটি জায়গার উল্লেখ করা হল যেগুলি আপনি অবশ্যই দেখবেন।
- টাকি রাজবাড়ি ।
- রাজবাড়ি দুর্গাদালান ।
- মিনি সুন্দরবন
- রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি।
- জোড়া শিব মন্দির।
- কুলেশ্বরী কালিবাড়ি।
- ইকোপার্ক।
- ইছামতী নদীতে নৌকা বিহার।
কিভাবে টাকি যাবেন
আপনারা টাকি দু ভাবেই ঘুরতে পারেন, এক একদিনেই সারাদিন ঘুরে আবার বিকেলের ট্রেনে ফিরে যেতে পারেন, এটাও ও কিন্তু খুবই জনপ্রিয় আর আপনি টাকিতে এক বা দু দিন থেকে পুরো টাকিটা ঘুরে দেখতে পারেন। শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোকাল ধরে আপনি টাকি রোড স্টেশনে নেমে পডুন, তারপর একটা টোটো রিজার্ভ করে জায়গা গুলো দেখে নিতে পারেন।
আপনি টাকি ভ্রমন নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে – টাকি ভ্রমণ – লিঙ্কে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন।
৪. নৈহাটির বড় মা

কালীপুজোয় উত্তর ২৪ পরগনার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নৈহাটির বড়মা কালী । জেলার পাশাপাশি দেশ, এমনকি বিদেশ থেকেও ভক্তরা এই মন্দিরে আসেন মনস্কামনা পূরণের জন্য। বর্তমানে নৈহাটির বড় মা বিখ্যাত রাজ্য তথা দেশজুড়ে, ২১ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ঘন কৃষ্ণবর্ণ প্রতিমা স্বর্ণলঙ্কারে ভূষিতা, বড় মা পুজোর মূলমন্ত্র হল ধর্ম হোক যার যার, বড় মা সবার, যে যার আশা বিশ্বাস নিয়ে বড়মার কাছে আসে পূজা দিতে। মায়ের ভক্তরা মানত করেন ও দন্ডি কাটেন, মনের ইচ্ছা পূরন হলেই ভক্তরা আবার মাকে অলঙ্কার গড়িয়ে দেন।
নৈহাটির সবচেয়ে প্রাচীন কালী পুজো এটি । আজ তাই সেই কালীকে সকলে চেনেন বড়মা বলেই। নৈহাটির বড় মার নাম শুনেনি এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই মুস্কিল। কালি পূজার সময়ে অত্যধিক ভিড় হয় এই পুজোয়। কালি পুজো ছাড়াও সারা বছরই এখানে ভক্তরা এসে থাকে। বড় মা পূজার সবচেয়ে প্রধান আকর্ষন হলো মা এর বিসর্জন, যেটা দেখতে কয়েক হাজার মানুষ এখানে ভিড় করে।
এখানকার মুর্তি বিসর্জনের আগে সোনার গহনার পরিবর্তে নতুন করে ফুলের সাজে সাজান হয়, তারপর গঙ্গা বক্ষে বিসর্জন হয়। ভক্তরা যাতে সারা বছরই মায়ের দর্শন পেতে পারে সেইজন্য কমিটি থেকে মায়ের ব্রোঞ্জের প্রতিমা গড়া হচ্ছে। নৈহাটি স্টেশনের একদম কাছে অবস্থিত এই মন্দিরটি আপনি স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটেই চলে আসতে পারেন এই মন্দিরে।
কিভাবে নৈহাটি যাবেন
শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট বা কৃষ্ণ নগর লোকাল ট্রেনে উঠে সোজা নৈহাটি স্টেশনে নামুন। বিকল্প হিসাবে হাওড়া ষ্টেশন থেকে ব্যান্ডেল বা বর্ধমান (ভায়া মেইন) চুঁচুড়া ষ্টেশন নেমে গঙ্গার অপর পাড়েই নৈহাটি পৌঁছে যাওয়া যায়।
৫. ব্যারাকপুর
ব্যারাকপুর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকেই সেনাবাহিনীর ব্যারাক ছিল এবং তা থেকেই এই ব্যারাকপুর নামটি এসেছে। সারা দেশে সিপাহী বিদ্রোহের সুচনা এই ব্যারাকপুরের সেনানিবাস থেকেই হয়েছিলো। ব্যারাকপুর শহর বা তার আশেপাশে দেখার মত প্রচুর জায়গা আছে যেগুলো হয়তো একদিনে কারুর পক্ষে একদিনে দেখে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমরা কয়েকটি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় জায়গার বিবরন দিলাম।
অন্নপূর্ণা মন্দির

ব্যারাকপুর ভ্রমণের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য হল এই অন্নপূর্ণা মন্দির। দক্ষিনেশ্বর মন্দির বানানোর ২০ বছর পর ১৮৭৫ সালে এই মন্দির টি নির্মিত হয়। রানী রাসমণি দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা শ্রীমতি জগদম্বা দেবী এই মন্দিরটি স্থাপন করেন, ওনার স্বামী শ্রী মথুরমোহন বিশ্বাসের ইচ্ছা পূরণ করতে। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই মন্দিরের উদ্বোধনের সময়ে এসেছিলেন বলে শোনাযায়। এই মন্দিরের ঠিক পেছনেই আছে রানী রাসমনি ঘাট। ব্যারাকপুর এবং টিটাগড় দুটি স্টেশন থেকেই টোটো করে এখানে আসা যাবে। খুবই সুন্দর একটা মন্দির।
গান্ধী ঘাট

অন্নপূর্ণা মন্দির থেকে কিছুটা দূরেই গঙ্গার তীরে এই গান্ধী ঘাট অবস্থিত। মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর পর তার চিতাভষ্ম ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিসর্জন দেওয়া হয়েছিলো, সেই জায়গা গুলোর মধ্যে একটি হল এই গাঁধীঘাট। জায়গাটি নামও সেই সময় থেকে হয়ে যায় গাঁধী ঘাট, জওহরলাল নেহেরু স্বয়ং তখন এখানে এসেছিলেন। তার পাশাপাশি এই ঘাটে গান্ধীজীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি সুদৃশ্য স্মৃতি স্তম্ভ ও নির্মাণ করা হয়েছে।
মঙ্গল পাণ্ডে পার্ক

ব্যারাকপুরের মঙ্গল পান্ডে পার্ক হল একটি সুন্দর পার্ক যা ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী প্রথম জাতীয়তাবাদী মঙ্গল পান্ডের সম্মানে নির্মিত হয়েছিল। মঙ্গল পাণ্ডে এই জায়গাটি থেকেই সিপাহী বিদ্রোহের সূত্রপাত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিলেন। এখানে সুন্দর সাজানো বাগান, মঙ্গল পাণ্ডেকে সম্মান জানিয়ে একটি মূর্তি এবং পাশেই আছে মঙ্গল পাণ্ডে ঘাট। খুবই সুন্দর একটা পরিবেশ নদীর ধারে বসে এখানে অনেকটা সময় কাটাতে পারবেন।
এগুলি ছাড়াও বার্থোলোমিউ ক্যাথেড্রাল, জওহর কুঞ্জ, লর্ড ক্যানিং স্ট্যাচু ও লেডি ক্যানিং এর সমাধি, গান্ধী মিউজিয়াম, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন বা ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য।
৬. বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য

উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ মহকুমায় অবস্থিত বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বা পারমাদন ফরেস্ট। এই স্থান বনগাঁ শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে এবং কলকাতা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
এখানে প্রচুর চিত্রা হরিণ দেখা যায়। অভয়ারণ্য তৈরির শুরুতে আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে প্রথমে চারটি চিত্রা হরিণ আনা হয়। পরবর্তিতে তাদের সংখ্যাতেও যথেষ্ট উন্নতি হয়। এখানে প্রচুর পরিমানে দেশীয় পাখি প্রজাতি রয়েছে। অভয়ারণ্য ছাড়াও এই অঞ্চলে আরো বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
অন্যান্য আকর্ষণ কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত এই বনের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে সুন্দরী ইছামতী। আর জঙ্গলের অন্য পারে উপজাতি অধ্যুষিত মঙ্গলগঞ্জ গ্রামে ইংরেজদের নির্মম অত্যাচারের স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে কুখ্যাত নীলকুঠি। যা দেখতে ভিড় জমান পর্যটকরা। মঙ্গলগঞ্জের পার্ক একটি অসাধারণ পিকনিক স্পট। এছাড়াও এই মঙ্গলগঞ্জে নিলচাষীদের উপর ব্রিটিশদের অবর্ণনীয় অত্যাচারের চিহ্ন ধারণ করে টিকে রয়েছে ধ্বংসপ্রায় নীলকুঠি।
কীভাবে যাবেন বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য
কলকাতা থেকে সড়কপথে প্রায় ১১০ কিলোমিটার, নয় নয় করে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ। ট্রেনে যেতে চাইলে নামতে হবে বনগাঁ অথবা রানাঘাট স্টেশনে। স্টেশন থেকে বাস কিংবা ভাড়া করা গাড়িতে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যে।
৭. গোবরডাঙ্গা
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শ্যামরাম মুখোপাধ্যায় ইংরেজদের কাছ থেকে নিলামে গোবরডাঙার জমিদারি কেনেন। দক্ষ হাতে সেই জমিদারি এগিয়ে নিয়ে যান শ্যামরামের পুত্র কালিপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। গোবরডাঙার ইতিহাস তারও পুরনো বলে শোনা যায়। আমরা গোবরডাঙ্গার রাজবাড়ি, প্রসন্নময়ী কালি মন্দির ও বাওর সম্পর্কে আলোচনা করব।
প্রসন্নময়ী কালি মন্দির

উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবরডাঙ্গাতে আসার পর প্রথম যে জায়গাটিতে আপনাদের অবশ্যই যাওয়া উচিৎ সেটা হলো দুশো বছরের পুরনো মা প্রসন্নময়ী কালি মন্দির। ১৮২২ সালে জমিদার কালিপ্রসন্ন মুখ্যোপাধ্যায় এই কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠা করেন। এই দক্ষিণ মুখী কালি মন্দিরের ভেতরে কষ্টি পাথরের মা কালির একটি মূর্তি আছে, আর দুপাশে আছে দ্বাদশ শিব মন্দির।
গোবরডাঙ্গা রাজবাড়ি

গোবরডাঙ্গা প্রসন্নময়ী কালিবাড়ির পাশেই রয়েছে গোবরডাঙ্গা রাজবাড়ি বা মুখার্জি রাজবাড়ি। শোনাযায় মুখোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাসভূমি ছিল বর্তমানে বাংলাদেশের যশোরে, তারপর তারা কোনো কারণে এই গোবরডাঙ্গাতে এসে বসবাস শুরু করে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে তাঁরা এখানকার জমিদারি কিনে নেন। সেই থেকেই পথ চলা শুরু হয় এই গোবরডাঙ্গা রাজবাড়ি বা জমিদারবাড়ির।
বাওর

গোবরডাঙ্গার বিখ্যাত তার বাওরের জন্য। বাওর কথার অর্থ জলাশয়। যার মধ্যে একটি হল কঙ্কনা বাওর এবং বেরী বাওর। বেরী বাওরের নিমাই ঘাট থেকে আপনি এখানে নৌকা বিহার ও করতে পারেন। পাঁচপোতা বাজার থেকে এর দুরত্ব মাত্র ৫ মিনিট। এছাড়াও এই গোবরডাঙ্গাতে দেখার মত আরো কিছু পেয়ে যাবেন, সারাদিনের জন্য ভালো একটা ট্যুর হতে পারে।
কিভাবে যাবেন গোবরডাঙ্গা
শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে বনগাঁ লোকাল ধরে গোবরডাঙ্গা স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে প্রসন্নময়ী কালি মন্দির, রাজবাড়ি বা বাওর যেতে স্টেশনের কাছেই টোটো ও ভ্যান স্ট্যান্ড পেয়ে যাবেন।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷



