কলকাতা থেকে অফবিট ডে ট্যুর কলকাতার কাছে এমন ৫টি জায়গার হদিশ দেয় যেখানে ভিড়ভাট্টা কম, সুন্দর প্রকৃতি মন ভরে যাওয়া আর খরচও নাগালে।

পুজোর ঠিক আগে-পরে আকাশে যখন সাদা মেঘ ভাসে, কাশফুল দুলতে থাকে নদীর পাড়ে, তখন মন কেবল ছুটে যেতে চায় শহরের কোলাহল ছেড়ে। কিন্তু হাতে সময় কম, ছুটিও বেশি নেই — এমন অবস্থায় দিঘা-মন্দারমণি বা দার্জিলিং-এর ভিড় ঠেলে না গিয়ে বরং বেছে নিন কলকাতার একদম কাছের কিছু অফবিট জায়গা। এই লেখায় রইল এমন ৫টি জায়গার হদিশ, যেখানে ভিড়ভাট্টা কম, প্রকৃতি বেশি, আর খরচও হাতের নাগালে।
সংক্ষেপে বলি — কলকাতা থেকে সেরা ৫টি অফবিট ডে ট্যুর ডেস্টিনেশন হল: গাদিয়াড়া (নদী সঙ্গম), গড়চুমুক (হরিণ পার্ক ও ইকো ট্যুরিজম), বাওয়ালি রাজবাড়ি (হেরিটেজ প্রাসাদ), ইটাচুনা রাজবাড়ি (৩০০ বছরের পুরনো জমিদারবাড়ি) এবং অম্বিকা কালনা (টেরাকোটা মন্দিরের শহর)। প্রতিটি জায়গা কলকাতা থেকে ৫০-৯০ কিলোমিটারের মধ্যে, মাথাপিছু খরচ মোটামুটি ৫০০-১৫০০ টাকার মধ্যেই সম্ভব, আর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর — এই তিন মাস ভ্রমণের জন্য আদর্শ সময়, কারণ বর্ষা কমে আসে অথচ গরম পড়ে না।
কলকাতা থেকে অফবিট ডে ট্যুর
এই পাঁচটি জায়গার প্রতিটিই আলাদা স্বাদের — কোথাও নদীর ঢেউয়ের শব্দ, কোথাও পুরনো ইটের গায়ে লেগে থাকা ইতিহাসের গন্ধ, আবার কোথাও টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকাজ। একদিনের ছুটিতে ঘরে বসে না থেকে, বা বারবার একই জায়গায় গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হাঁসফাঁস না করে, এবার একটু অন্যরকম কিছু বেছে নেওয়াই যায়। নিচে প্রতিটি জায়গার বিস্তারিত বর্ণনা, যাওয়ার উপায়, খরচের হিসেব এবং কিছু ছোট্ট পরামর্শ দেওয়া হল, যাতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে আপনার আর কোনো অসুবিধা না হয়।
কেন সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর ভ্রমণের সেরা সময়?
বর্ষার শেষ ভাগে নদী-নালা টইটম্বুর থাকে, চারদিক সবুজ, আবার শীতের কনকনে ঠান্ডাও পড়েনি। আকাশ থাকে ঝকঝকে নীল, রোদও কড়া নয়। এই সময় নদীর ধারের জায়গাগুলোতে (যেমন গাদিয়াড়া, গড়চুমুক) জল থাকে ভরপুর, ফলে নৌকাবিহার বা নদীর দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর দেখায়। আবার হেরিটেজ জায়গাগুলোতেও (রাজবাড়ি, মন্দির) হাঁটাচলা করার জন্য আবহাওয়া থাকে আরামদায়ক। তাই একদিনের ট্যুরের জন্য এই তিন মাস সত্যিই সোনায় সোহাগা।
১. গাদিয়াড়া — তিন নদীর মিলনস্থলে এক সন্ধ্যা
কী বিশেষত্ব
হাওড়া জেলার শ্যামপুরে, দামোদর, রূপনারায়ণ ও হুগলি নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত গাদিয়াড়া। এই জায়গাটি দামোদর, রূপনারায়ণ এবং হুগলি নদির সঙ্গমস্থলে অবস্থিত, আর এই সঙ্গমের একদিকে হলদিয়া, একদিকে নুরপুর এবং অন্যদিকে গাদিয়াড়া অবস্থিত। সন্ধ্যাবেলা এই তিন জনপদের আলো নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে এক অদ্ভুত মায়াময় দৃশ্যের সৃষ্টি করে। নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা, ছোট্ট নৌকায় ভেসে বেড়ানো, আর তাজা ইলিশ বা চিংড়ি দিয়ে দুপুরের খাওয়া — এখানকার আসল আকর্ষণ। যাঁরা শহরের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে শুধু নদী আর আকাশ দেখতে চান, তাঁদের জন্য এটি আদর্শ। বিকেল ৪টার পর নদীর ঘাটে গিয়ে বসলে সূর্যাস্তের রং ধীরে ধীরে পাল্টাতে দেখা যায়, আর সেই মুহূর্তে ক্যামেরা হাতে থাকলে দারুণ কিছু ছবি তোলা যায়। নদীর ধারে ছোট ছোট কয়েকটি হোমস্টে ও রিসর্টও গড়ে উঠেছে, যেখানে চাইলে সন্ধ্যার নাস্তা সেরে ফেরার পথ ধরা যায়।
কীভাবে যাবেন
- ট্রেনে: হাওড়া স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেনে উলুবেড়িয়া বা বাগনান স্টেশনে নেমে, সেখান থেকে শ্যামপুর হয়ে বাসে বা টোটোয় প্রায় ৮ কিলোমিটার গেলেই গাদিয়াড়া পৌঁছে যাবেন।
- বাসে: এসপ্ল্যানেড বাস টার্মিনাস থেকে সরাসরি সাধারণ বা বাতানুকূল বাস পাওয়া যায় গাদিয়াড়ার উদ্দেশ্যে।
- গাড়িতে: বিদ্যাসাগর সেতু, কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ও ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে উলুবেড়িয়া হয়ে গেলে কলকাতা থেকে আনুমানিক ৫০ কিলোমিটার দূরত্বের এই পথ প্রায় ১ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়।
আনুমানিক খরচ (মাথাপিছু)
- ট্রেন + লোকাল যাতায়াত: ৫০-১০০ টাকা
- বাস (এসি/নন-এসি): ১০০-১৫০ টাকা
- গাড়ি ভাড়া করলে (সারাদিনের জন্য, ৪ জনের গ্রুপে ভাগ করে): জনপ্রতি ৭০০-৯০০ টাকা
- নৌকাভ্রমণ: ১৫০-৩০০ টাকা (নৌকা ও সময় অনুযায়ী)
- দুপুরের খাওয়া (নদীর ধারের ধাবা বা রিসর্টে): ২০০-৪০০ টাকা
মোট আনুমানিক খরচ: ৫০০-৮০০ টাকা মাথাপিছু (গাড়ি নিলে একটু বেশি)।
আরও পড়ুন – একটি আদর্শ কলকাতা ডে ট্যুর গ্রীষ্মকালে শহর ভ্রমণ
২. গড়চুমুক — হরিণ, পাখি আর নদীর সঙ্গমের ইকো-ট্যুরিজম
কী বিশেষত্ব
গাদিয়াড়া থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার দূরে, হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়ার কাছে হুগলি ও দামোদর নদীর মিলনস্থলে গড়ে উঠেছে গড়চুমুক পর্যটন কেন্দ্র। কলকাতা থেকে গড়চুমুকের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। এখানকার মূল আকর্ষণ হল হরিণ পার্ক এবং মিনি চিড়িয়াখানা — এখানে হরিণের পাশাপাশি কুমির, সজারু, বাঘরোলের মতো প্রাণী এবং নানা রকম পাখিও দেখা যায়। এছাড়া দামোদর নদীর ওপর ৫৮টি লকগেট (যা স্থানীয়ভাবে “৫৮ গেট” নামে পরিচিত) এবং চারপাশের কৃত্রিম বনসৃজন এলাকা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য দারুণ এক পিকনিক স্পট। যাঁরা পরিবার নিয়ে শান্ত পরিবেশে হাঁটাহাঁটি, পাখি দেখা আর ছবি তোলার জায়গা খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এটি একেবারে উপযুক্ত। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে নদীতে জল বেশি থাকায় লকগেট এলাকার দৃশ্য বিশেষভাবে সুন্দর দেখায়, আর বনসৃজনের সবুজে ভরা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ছোট-বড় সকলেরই ভালো লাগবে। চাইলে সঙ্গে হালকা টিফিন নিয়ে নদীর ধারে বসে পিকনিকও সেরে নেওয়া যায়।
কীভাবে যাবেন
- ট্রেনে: হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে উলুবেড়িয়া বা বাউড়িয়া স্টেশনে নেমে অটো বা টোটোয় গড়চুমুক পৌঁছানো যায়।
- বাসে: ধর্মতলা বা এসপ্ল্যানেড থেকে উলুবেড়িয়াগামী বাসে গিয়ে সেখান থেকে স্থানীয় গাড়িতে যাওয়া যায়।
- গাড়িতে: কোনা এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ।
আনুমানিক খরচ (মাথাপিছু)
- মিনি চিড়িয়াখানা ও ডিয়ার পার্কের প্রবেশ মূল্য মাত্র ১০ টাকা।
- ট্রেন/বাস যাতায়াত: ৮০-১৫০ টাকা
- গাড়ি ভাড়া (গ্রুপে ভাগ করে): জনপ্রতি ৭০০-৯০০ টাকা
- দুপুরের খাওয়া (স্থানীয় রেস্তোরাঁয় বাঙালি খাবার): ২০০-৩৫০ টাকা
মোট আনুমানিক খরচ: ৪০০-৭০০ টাকা মাথাপিছু। চাইলে গাদিয়াড়া আর গড়চুমুক একই দিনে জুড়ে নেওয়া যায়, কারণ দুটির দূরত্ব মাত্র ২৩ কিলোমিটার।
৩. বাওয়ালি রাজবাড়ি — শহরের একদম কাছে জমিদারি ঠাটবাট
কী বিশেষত্ব
দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুরের কাছে অবস্থিত বাওয়ালি রাজবাড়ি এমন এক জায়গা, যেখানে গেলে মনে হবে সময় থমকে গেছে কয়েকশো বছর আগে। ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্যে তৈরি এই প্রাসাদ এখন হেরিটেজ রিসর্টে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে বড় বড় থাম, পুরনো দালান আর সবুজ প্রাঙ্গণ মিলিয়ে এক রাজকীয় অনুভূতি পাওয়া যায়। একদিনের জন্য গেলেও এখানে হেরিটেজ ওয়াক, ঐতিহ্যবাহী বাংলা থালি খাওয়া আর ছবি তোলার সুযোগ পাওয়া যায় ভরপুর। যাঁরা কম দূরত্বে ইতিহাস আর স্থাপত্যের স্বাদ পেতে চান, তাঁদের জন্য এটি সেরা পছন্দ। প্রাসাদের ভেতরের পুরনো লাইব্রেরি ঘর, ছাদের ঝুলবারান্দা এবং প্রশস্ত সবুজ বাগান ঘুরে দেখতে দেখতে সময় কীভাবে কেটে যায় বোঝাই যায় না। যাঁরা ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এখানকার প্রতিটি কোণাই যেন একেকটা ফ্রেম।
কীভাবে যাবেন
- ট্রেনে: শিয়ালদহ থেকে লক্ষ্মীকান্তপুর বা বারুইপুর লাইনের লোকাল ট্রেনে বারুইপুর স্টেশনে নেমে, সেখান থেকে অটো বা টোটোয় ২০-২৫ মিনিটের পথ বাওয়ালি রাজবাড়ি।
- গাড়িতে: ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে বারুইপুর হয়ে গেলে কলকাতা থেকে প্রায় ৩৫-৪০ কিলোমিটার, সময় লাগে এক ঘণ্টার মতো।
আনুমানিক খরচ (মাথাপিছু)
- ট্রেন যাতায়াত: ৩০-৫০ টাকা
- অটো/টোটো: ৫০-১০০ টাকা
- গাড়ি ভাড়া (গ্রুপে ভাগ করে): জনপ্রতি ৫০০-৭০০ টাকা
- হেরিটেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশ ও দুপুরের বাংলা থালি: ৫০০-৮০০ টাকা
মোট আনুমানিক খরচ: ৭০০-১২০০ টাকা মাথাপিছু (খাওয়া-দাওয়ার প্যাকেজ নিলে একটু বেশি পড়তে পারে)।
আরও পড়ুন –
৪. ইটাচুনা রাজবাড়ি — বর্গী আমলের রহস্য মোড়া জমিদারবাড়ি
কী বিশেষত্ব
হুগলি জেলার পান্ডুয়ার কাছে সানকপুর গ্রামে অবস্থিত ইটাচুনা রাজবাড়ি। কুন্ডু পরিবারের পূর্বপুরুষরা ১৭৬৬ সালে এই রাজবাড়ি তৈরি করেন, যা এখন প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো এক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। মারাঠা বর্গীদের সঙ্গে জড়িত ইতিহাস, পুরনো ফাঁকা করিডোর, আর রাতের বেলা শোনা যায় এমন অনেক লোককথা — সব মিলিয়ে ইটাচুনা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয়। দিনের বেলা গেলে দেখা যায় প্রাসাদের পুরনো স্থাপত্য, বিশাল উঠোন, আর ঐতিহ্যবাহী “রাজকীয় থালি” খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে অনেক প্যাকেজে। ইতিহাস আর একটু রহস্যপ্রেমী যাঁরা, তাঁদের জন্য এই জায়গা মিস করা উচিত নয়। রাজবাড়ির স্থানীয় পরিচারকদের মুখে বর্গী আক্রমণের সময়কার নানা গল্প শুনতে শুনতে গা ছমছম করা এক অনুভূতি হয়, যা শুধু বই পড়ে পাওয়া যায় না। দিনের আলোয় ঘুরে দেখার পর সন্ধ্যা নামার আগেই ফেরার পথ ধরাই ভালো, কারণ গ্রামীণ এলাকায় রাতের দিকে যানবাহন কমে আসে।
কীভাবে যাবেন
- ট্রেনে: হাওড়া থেকে বর্ধমান মেন লাইনের যেকোনো লোকাল ট্রেনে খন্যান স্টেশনে নেমে, সেখান থেকে অটো বা রিকশায় মাত্র সাত থেকে দশ মিনিটের পথ ইটাচুনা রাজবাড়ি।
- গাড়িতে: দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে হালুসাই হয়ে গেলে কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ৬৬ কিলোমিটার, সময় লাগে দেড় ঘণ্টার মতো।
আনুমানিক খরচ (মাথাপিছু)
- ট্রেন যাতায়াত: ৪০-৬০ টাকা
- অটো/রিকশা: ৩০-৫০ টাকা
- গাড়ি ভাড়া (গ্রুপে ভাগ করে): জনপ্রতি ৬০০-৮০০ টাকা
- রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী থালি (দুপুরের খাওয়া): ৪০০-৭০০ টাকা
মোট আনুমানিক খরচ: ৭০০-১৩০০ টাকা মাথাপিছু।
৫. অম্বিকা কালনা — টেরাকোটা মন্দিরের শহর
কী বিশেষত্ব
পূর্ব বর্ধমান জেলার ছোট্ট শহর কালনা পরিচিত ঐশ্বর্যপূর্ণ পোড়ামাটির মন্দিরের জন্য, যে কারণে একে “মন্দিরের শহর”ও বলা হয়। এখানকার ১০৮ শিব মন্দির (দুটি অন্তর্বৃত্তাকার বলয়ে সাজানো ১০৮টি শিবমন্দির) এবং রাজবাড়ি চত্বরের প্রতাপেশ্বর মন্দিরের অপূর্ব টেরাকোটা কারুকাজ চোখ ফেরানো যায় না এমন সুন্দর। ইতিহাস, স্থাপত্য আর হাতের কাজের প্রতি যাঁদের আগ্রহ, তাঁদের জন্য কালনা একদিনের সেরা গন্তব্য। মন্দির চত্বর ঘুরে দেখতে দেখতে হাতে সময় থাকলে কাছেই গঙ্গার ঘাটেও কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসা যায়। প্রতিটি মন্দিরের গায়ে খোদাই করা রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, পৌরাণিক দৃশ্য আর গ্রামীণ জীবনের ছবি দেখলে বোঝা যায় সেকালের কারিগরদের হাতের কাজ কতটা নিখুঁত ছিল। ফটোগ্রাফির শখ থাকলে সকালের নরম আলোয় মন্দিরের টেরাকোটার কাজ সবচেয়ে ভালো ফুটে ওঠে, তাই সকাল সকাল পৌঁছানোর চেষ্টা করাই ভালো।
কীভাবে যাবেন
- ট্রেনে: হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল হয়ে অম্বিকা-কালনা স্টেশন পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ৮২ কিলোমিটার, শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাটোয়াগামী লোকাল ট্রেনেও যাওয়া যায়। স্টেশন থেকে মন্দির চত্বর হাঁটাপথে বা টোটোয় কয়েক মিনিটের দূরত্ব।
- গাড়িতে: দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে বা জিটি রোড ধরে কলকাতা থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার, সময় লাগে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।
আনুমানিক খরচ (মাথাপিছু)
- ট্রেন যাতায়াত (আপ-ডাউন): ৬০-১০০ টাকা
- স্থানীয় টোটো/রিকশা: ৫০-১০০ টাকা
- গাড়ি ভাড়া (গ্রুপে ভাগ করে): জনপ্রতি ৮০০-১০০০ টাকা
- দুপুরের খাওয়া: ২০০-৩৫০ টাকা
মোট আনুমানিক খরচ: ৫০০-৯০০ টাকা মাথাপিছু (ট্রেনে গেলে), গাড়িতে গেলে ১২০০-১৫০০ টাকা পর্যন্ত।
সংক্ষিপ্ত তুলনা: এক নজরে ৫টি জায়গা
| জায়গা | দূরত্ব (কলকাতা থেকে) | মূল আকর্ষণ | আনুমানিক খরচ (মাথাপিছু) |
|---|---|---|---|
| গাদিয়াড়া | ~৫০ কিমি | তিন নদীর সঙ্গম, সূর্যাস্ত | ৫০০-৮০০ টাকা |
| গড়চুমুক | ~৬০ কিমি | হরিণ পার্ক, ইকো ট্যুরিজম | ৪০০-৭০০ টাকা |
| বাওয়ালি রাজবাড়ি | ~৩৫-৪০ কিমি | হেরিটেজ প্রাসাদ | ৭০০-১২০০ টাকা |
| ইটাচুনা রাজবাড়ি | ~৬৬ কিমি | ২৫০ বছরের জমিদারবাড়ি | ৭০০-১৩০০ টাকা |
| অম্বিকা কালনা | ~৮২-৯০ কিমি | টেরাকোটা মন্দির | ৫০০-১৫০০ টাকা |
ভ্রমণের আগে কয়েকটি জরুরি পরামর্শ
- সকাল সকাল বেরোন: একদিনের ট্যুরে বেশি জায়গা ঘুরতে ও ফেরার পথে ট্রাফিক এড়াতে সকাল ৭-৮টার মধ্যে রওনা দেওয়াই ভালো।
- আবহাওয়া দেখে নিন: সেপ্টেম্বরে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হতে পারে, তাই ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন।
- গ্রুপে গেলে গাড়ি ভাড়া সাশ্রয়ী: ৪-৫ জনের দল হলে সারাদিনের জন্য গাড়ি ভাড়া করে খরচ ভাগ করে নেওয়া সবচেয়ে লাভজনক।
- নদীর ধারের জায়গায় সাঁতার না জানলে সতর্ক থাকুন: গাদিয়াড়া বা গড়চুমুকের মতো নদী তীরবর্তী জায়গায় জলের কাছে সাবধানে থাকুন।
- রাজবাড়িতে আগে থেকে খোঁজ নিন: বাওয়ালি বা ইটাচুনা রাজবাড়িতে থালি খেতে চাইলে আগে থেকে ফোনে বুকিং করে নেওয়া ভালো, নয়তো ভিড়ের দিনে সময় নষ্ট হতে পারে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: কলকাতা থেকে একদিনে কোন জায়গাটি সবচেয়ে কম খরচে ঘোরা যায়?
উত্তর: গড়চুমুক এবং গাদিয়াড়া — এই দুটি জায়গা একসঙ্গে ট্রেন বা বাসে গেলে মাথাপিছু ৫০০-৭০০ টাকার মধ্যেই ঘোরা সম্ভব।
প্রশ্ন: পরিবারের সঙ্গে ছোট বাচ্চা নিয়ে গেলে কোনটি ভালো?
উত্তর: গড়চুমুক সবচেয়ে ভালো, কারণ এখানে হরিণ পার্ক ও মিনি চিড়িয়াখানা আছে, যা বাচ্চাদের জন্য আকর্ষণীয় এবং জায়গাটি ঘোরাফেরার জন্যও নিরাপদ।
প্রশ্ন: ইতিহাস আর স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য কোনটা বেছে নেওয়া উচিত?
উত্তর: বাওয়ালি রাজবাড়ি, ইটাচুনা রাজবাড়ি এবং অম্বিকা কালনা — এই তিনটি জায়গাই ইতিহাস ও স্থাপত্যের দিক থেকে সমৃদ্ধ, তবে টেরাকোটা মন্দিরের কাজ দেখতে চাইলে কালনাই সেরা।
প্রশ্ন: শুধু ট্রেনে করে যাওয়া যায় কি, নাকি গাড়ি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: পাঁচটি জায়গাতেই ট্রেনে করে পৌঁছানো যায়, এরপর স্থানীয় অটো বা টোটোয় গন্তব্যে যেতে হয়। গাড়ি থাকলে সময় বাঁচে এবং একই দিনে দুটি কাছাকাছি জায়গা (যেমন গাদিয়াড়া ও গড়চুমুক) ঘুরে নেওয়া সহজ হয়।
প্রশ্ন: সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বরে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা কী?
উত্তর: এই সময় বর্ষা কমে আসায় নদী ভরপুর থাকে, চারপাশ সবুজ থাকে, আবার শীতের কড়া ঠান্ডাও পড়ে না — ফলে হাঁটাচলা ও ছবি তোলার জন্য এটাই সবচেয়ে আরামদায়ক সময়।
শহরের বাইরে বেরোনোর জন্য সবসময় লম্বা ছুটি বা দূরের গন্তব্যের দরকার হয় না। কলকাতার আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা এই অফবিট জায়গাগুলো প্রমাণ করে দেয়, একদিনের ছুটিতেও মন ভরে যাওয়া সম্ভব। পরের বার উইকএন্ড এলে ভিড়ের রাস্তা এড়িয়ে বরং এই পাঁচটি ঠিকানার যেকোনো একটি বেছে নিন — নদী, ইতিহাস আর প্রকৃতি, সব একসঙ্গে পেয়ে যাবেন।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷




