
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে দোল বা হোলি শুধু রঙের উৎসব নয়, এটি ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার এক অনন্য সাংস্কৃতিক মাধ্যম। ২০২৬ সালে দোল পূর্ণিমা পড়েছে ৩রা মার্চ (মঙ্গলবার)। হাতে এখন অনেকটা সময় থাকলেও, সপরিবারে ছুটি কাটাতে যাওয়ার পরিকল্পনা এখনই সেরে ফেলা ভালো, কারণ এই সময় বুকিং পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
আপনি যদি পরিবারের সাথে দোল উদযাপনের জন্য শান্তিনিকেতন, পুরুলিয়া বা অন্য কোনো অফবিট জায়গার মধ্যে দ্বিধায় থাকেন, তবে এই বিস্তারিত গাইডটি আপনার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
দোল পূর্ণিমা ২০২৬: সপরিবারে কোথায় যাবেন? (বিস্তারিত গাইড)
পশ্চিমবঙ্গের লাল মাটির সংস্কৃতি আর বসন্তের পলাশ—এই দুই মিলিয়ে দোল হয়ে ওঠে এক মায়াবী অভিজ্ঞতা। নিচে আমরা জনপ্রিয় তিনটি গন্তব্যের তুলনামূলক আলোচনা এবং খরচের ধারণা দিচ্ছি।
১. শান্তিনিকেতন: বসন্ত উৎসবের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র
শান্তিনিকেতনের দোল মানেই কবিগুরুর সেই অমর গান—”ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল”। এখানকার ‘বসন্ত উৎসব’ এক বিশ্বজনীন আবেদন রাখে।
কেন যাবেন?
- সাংস্কৃতিক পরিবেশ: ছাত্রছাত্রীদের আবৃত্তি, রবীন্দ্রনাথের গানে নৃত্য আর আবিরের মিলন মেলা।
- সোনাঝুরির হাট: খোয়াইয়ের সোনাঝুরি জঙ্গলে বাউল গান আর আদিবাসী নাচের সাথে দোল উদযাপন এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
- শান্তি ও শিক্ষা: উত্তরায়ণ, মিউজিয়াম এবং বিশ্বভারতী চত্বর পরিভ্রমণ বাচ্চাদের জন্য শিক্ষামূলক হতে পারে।
প্রয়োজনীয় তথ্য:
- কীভাবে যাবেন: কলকাতা (হাওড়া/শিয়ালদহ) থেকে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস বা অগ্নিবীণা ধরে বোলপুর স্টেশনে নামুন (সময় লাগে ২-৩ ঘণ্টা)। সড়কপথে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ৩-৪ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়।
- থাকার জায়গা: শান্তিনিকেতনে প্রচুর রিসোর্ট এবং হোমস্টে আছে। দোলের সময় অন্তত ৩ মাস আগে বুকিং করা জরুরি।
- টিপস: বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসের ভেতরে এখন বাইরের পর্যটকদের প্রবেশাধিকার কিছুটা সীমিত থাকে, তাই সোনাঝুরি বা খোয়াইয়ের আশেপাশের বেসরকারি রিসোর্টগুলির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া বেশি আরামদায়ক হবে।
খরচের ধারণা (২ রাত ৩ দিন):
- বাজেট ট্রিপ: মাথাপিছু ৫,০০০ – ৭,০০০ টাকা (সাধারণ লজ ও খাবার)।
- মাঝারি বা বিলাসবহুল: মাথাপিছু ১০,০০০ – ১৫,০০০ টাকা (এসি রিসোর্ট ও ট্রান্সপোর্ট)।
আরও পড়ুন – পশ্চিমবঙ্গে 15টি জনপ্রিয় মেলা ও প্রদর্শনী: কোথায়, কবে সব তথ্য
২. পুরুলিয়া: পলাশের রঙে রাঙানো বুনো দোল
যাঁরা কোলাহল মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে দোল কাটাতে চান, তাদের জন্য পুরুলিয়া সেরা বিকল্প। বসন্তের এই সময়টা পুরুলিয়ার জঙ্গল পলাশ ফুলে লাল হয়ে থাকে, যাকে বলা হয় ‘অরণ্যের অগ্নিশিখা’ (Flame of the Forest)।
কেন যাবেন?
- পলাশ উৎসব: অযোধ্যা পাহাড়, বাঘমুন্ডি বা মুরগুমা—সবই তখন রক্তবর্ণ।
- লোকসংস্কৃতি: ছৌ নাচ, ঝুমুর গান আর নাটুয়া নাচের ছন্দ আপনার মন ভরিয়ে দেবে।
- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: বামনী জলপ্রপাত, আপার ও লোয়ার ড্যাম এবং নীল নির্জনতার মুরগুমা লেক।
প্রয়োজনীয় তথ্য:
- কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে চাকধরপুর প্যাসেঞ্জার বা রূপসী বাংলা এক্সপ্রেসে পুরুলিয়া বা বরাভূম স্টেশনে নামুন (৬-৭ ঘণ্টা)।
- থাকার জায়গা: বাঘমুন্ডি বা অযোধ্যা পাহাড়ের উপরে ভালো গেস্ট হাউস আছে। মুরগুমা লেকের ধারে ইকো-রিসোর্টগুলো দারুণ অপশন।
- টিপস: পুরুলিয়ার রোদ এই সময় কিছুটা কড়া হতে পারে, তাই সাথে টুপি ও সানস্ক্রিন রাখবেন।
খরচের ধারণা (২ রাত ৩ দিন):
- বাজেট ট্রিপ: মাথাপিছু ৪,৫০০ – ৬,০০০ টাকা।
- মাঝারি: মাথাপিছু ৭,০০০ – ৯,০০০ টাকা।
আরও পড়ুন – স্লো ট্রাভেল: ধীরে ভ্রমণ করার গাইড—কেন এবং কীভাবে
৩. মায়াপুর: আধ্যাত্মিক দোলযাত্রা
আপনি যদি পরিবার নিয়ে ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে দোল কাটাতে চান, তবে নবদ্বীপ-মায়াপুর আপনার গন্তব্য হতে পারে। মহাপ্রভুর জন্মস্থান হিসেবে এখানে দোল বা ‘গৌর পূর্ণিমা’ অত্যন্ত আড়ম্বরে পালিত হয়।
কেন যাবেন?
- ইস্কন (ISKCON) মন্দির: বিশাল চত্বর, ভজন, কীর্তন আর বিদেশি ভক্তদের সাথে রঙের খেলা।
- ফুলের দোল: এখানে আবিরের পাশাপাশি ফুলের পাঁপড়ি দিয়ে হোলি খেলা হয়, যা বেশ মনোরম।
- শান্ত পরিবেশ: ভাগীরথী নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখা আর পরিবারের সাথে মন্দির দর্শন।
খরচের ধারণা:
- খুবই সাশ্রয়ী। মায়াপুর ইস্কন গেস্ট হাউসে থাকলে ৩,০০০ – ৫,০০০ টাকার মধ্যে মাথাপিছু খরচ সম্ভব।
গন্তব্য নির্বাচন: একটি তুলনামূলক ছক
| বিশেষত্ব | শান্তিনিকেতন | পুরুলিয়া | মায়াপুর |
|---|---|---|---|
| মূল আকর্ষণ | রবীন্দ্রনাথের গান ও সংস্কৃতি | পলাশ ফুল ও লোকসংস্কৃতি | আধ্যাত্মিকতা ও কীর্তন |
| ভিড়ের মাত্রা | অত্যন্ত বেশি | মাঝারি | বেশি |
| পরিবারের জন্য | সেরা (সাংস্কৃতিক মনস্ক হলে) | সেরা (প্রকৃতি প্রেমিক হলে) | সেরা (বয়স্কদের জন্য আদর্শ) |
| যাতায়াত সময় | ৩ – ৪ ঘণ্টা | ৬ – ৭ ঘণ্টা | ৩ – ৪ ঘণ্টা |
সপরিবারে দোল ভ্রমণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ টিপস
১. আগাম বুকিং (Advance Booking): দোল উপলক্ষে এই সব জায়গায় ট্রেনের টিকিট এবং ভালো হোটেল ২-৩ মাস আগেই শেষ হয়ে যায়। তাই শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করবেন না।
২. চালের সতর্কতা: পরিবারের সাথে গেলে ভেষজ বা হার্বাল আবির ব্যবহার করুন, যাতে বাচ্চাদের বা বড়দের ত্বকের ক্ষতি না হয়।
৩. প্রয়োজনীয় ওষুধ: সাথে পেটের ওষুধ, ওআরএস (ORS) এবং সানস্ক্রিন অবশ্যই রাখুন।
৪. পোশাক: শান্তিনিকেতন গেলে হলুদ রঙের বাসন্তী পোশাক সাথে নিতে পারেন, যা ওখানকার উৎসবের থিম। পুরুলিয়ার জন্য হালকা সুতির আরামদায়ক পোশাক বেছে নিন।
উপসংহার
দোল পূর্ণিমা মানেই বিভেদ ভুলে মানুষের সাথে মিলেমিশে যাওয়ার উৎসব এই দোল পূর্ণিমা। আপনি যদি সংস্কৃতির ছোঁয়া পেতে চান তবে শান্তিনিকেতন বেছে নিন, আর যদি পাহাড় ও বুনো পলাশের মায়ায় হারানো আপনার পছন্দ হয়, তবে পুরুলিয়া হবে আপনার শ্রেষ্ঠ গন্তব্য।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷


