
কলকাতা থেকে বাইক ভ্রমণ আডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য প্রচুর অপশন রয়েছে। প্রকৃতির বিনোদনের জন্য বাইক রাইডের জন্য ১০টি দুর্দান্ত গন্তব্যের সূচী দেওয়া। কলকাতা উপকূলীয় ভ্রমণ থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক শহর এবং প্রকৃতির বিনোদনের জন্য বাইক রাইডের জন্য ১০টি দুর্দান্ত গন্তব্য রয়েছে যেখানে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে সুন্দরবন, বকখালি, বিষ্ণুপুর, শান্তিনিকেতন, মন্দারমণি এবং দীঘার মতো জনপ্রিয় পছন্দ রয়েছে। দীর্ঘ ভ্রমণের জন্য, মুকুটমণিপুরের মতো গন্তব্য বা এমনকি দার্জিলিং ভ্রমণ বিবেচনা করতে পারেন ।
কলকাতা থেকে বাইক ভ্রমণ: সেরা 10 টি গন্তব্য
উপকূল বরাবর:
- সুন্দরবন: কলকাতা থেকে প্রায় ১০২ কিলোমিটার দূরে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং এর বন্যপ্রাণী অন্বেষণ করুন।
- বকখালি: একটি শান্ত উপকূলীয় শহর, প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে।
- মন্দারমণি: কলকাতা থেকে প্রায় ১৭২ কিলোমিটার দূরে তার নির্মল সৈকত এবং উপকূলীয় অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত।
- দীঘা: সু-রক্ষিত রাস্তা সহ একটি জনপ্রিয় সৈকত গন্তব্য।
সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক রুট:
- বিষ্ণুপুর: কলকাতা থেকে প্রায় ১৩৮ কিলোমিটার দূরে তার পোড়ামাটির মন্দির এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য বিখ্যাত।
- শান্তিনিকেতন: শিল্প ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল, কলকাতা থেকে প্রায় ১৬১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চার:
- পিয়ালি দ্বীপ: সুন্দরবনের একটি মনোরম অবস্থান এবং প্রবেশদ্বার, সাইকেল দ্বারা যাতায়াত করা যায়।
- মুকুটমণিপুর: মনোরম সৌন্দর্য অফার করে এবং বাইক চালানোর জন্য একটি নিখুঁত গন্তব্য।
- অযোধ্যা পাহাড়: আদিবাসী সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা অর্জন করুন এবং কলকাতা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে এই অঞ্চলে অপ্রচলিত পথগুলি ঘুরে দেখুন।
বেশ দীর্ঘ ড্রাইভ:
- দার্জিলিং: হিমালয়ের গায়ে মেঘের কোলে এক স্বপ্নময় যাত্রা, কলকাতা থেকে প্রায় ৬১৮ কিলোমিটার দূরে।
১. পিয়ালী দ্বীপ | দূরত্ব: ৬৭ কিমি
বঙ্গোপসাগরের শান্ত জলের মাঝে অবস্থিত পিয়ালী দ্বীপ যেন এক টুকরো স্বর্গ। এখানকার সবুজ ম্যানগ্রোভ বন, নিরিবিলি পরিবেশ ও প্রকৃতির রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবে।
- সময় লাগে: ২-৩ ঘণ্টা
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ
- রুট: কলকাতা – বারুইপুর – পিয়ালী দ্বীপ
- দর্শনীয় স্থান:
- পিয়ালী নদী: শান্ত নদীর বুকে নৌকা ভ্রমণের মাধ্যে প্রকৃতির নিবিড়তা উপভোগ করুন।
- ওয়াচ টাওয়ার: উপরে উঠে চারপাশের মোহময় দৃশ্য উপভোগ করুন।
- নেচার ইন্টারপ্রেটেশন সেন্টার: সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে জানার সুযোগ মেলে এখানে।
পড়ে দেখুন: ভারতের সেরা একাকী ভ্রমণ গন্তব্য, সব তথ্য সহ
২. সুন্দরবন | দূরত্ব: ১০২ কিমি

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনের প্রাণকেন্দ্রে যাত্রা করুন, যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
- সময় লাগে: ৩-৪ ঘণ্টা
- সেরা সময়: সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ
- রুট: কলকাতা – বসন্তী – গোধখালি – গোসাবা – সুন্দরবন
- দর্শনীয় স্থান:
- সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্ক: বোট সাফারিতে বাঘসহ নানা বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ।
- সজনেখালি পাখির অভয়ারণ্য: নানা ধরনের পাখি পর্যবেক্ষণের আদর্শ স্থান।
- দোবাঙ্কি ওয়াচ টাওয়ার: গাছের মাথার উপর থেকে বনের দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা অনন্য।
৩. বকখালি | দূরত্ব: ১২৫ কিমি

নিঃশব্দ সৈকত ও প্রাকৃতিক নির্জনতা উপভোগ করতে চাইলে বকখালি এক আদর্শ স্থান। সূর্যাস্ত, শান্ত বালি ও সাগরের হাওয়া মিলিয়ে এক মোহময় পরিবেশ।
- সময় লাগে: ৩-৪ ঘণ্টা
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ
- রুট: কলকাতা – বিষ্ণুপুর – উস্তি – কাকদ্বীপ – বকখালি
- দর্শনীয় স্থান:
- বকখালি সৈকত: নিরিবিলি সৈকতে সাগরের নীল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করুন।
- হেনরি দ্বীপ: নির্জন সৈকত, বনাঞ্চল ও পাখির আবাসস্থল।
- ফ্রেজারগঞ্জ উইন্ড পার্ক: এখান থেকে উপকূলের বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যায়।
পড়ে দেখুন: ভারতের সেরা 12 টি রাফটিং স্পট
৪. বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া | দূরত্ব: ১৩৮ কিমি

টেরাকোটার মন্দির ও লোকশিল্পের শহর বিষ্ণুপুর, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য মিলনস্থল।
- সময় লাগে: ৩-৪ ঘণ্টা
- সেরা সময়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি
- রুট: কলকাতা – বরানগর – চাঁপাডাঙ্গা – কোটুলপুর – বিষ্ণুপুর
- দর্শনীয় স্থান:
- রস মঞ্চ: মল্ল রাজাদের তৈরি ১৭শ শতাব্দীর বিখ্যাত টেরাকোটা মন্দির।
- জোরবাংলা মন্দির: নকশা ও কারুকার্যে সমৃদ্ধ এই মন্দির স্থাপত্যপ্রেমীদের আকর্ষণ করে।
- মদন মোহন মন্দির: টেরাকোটার দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য ও প্যানেল দিয়ে সাজানো মন্দির।
৫. শান্তিনিকেতন | দূরত্ব: ১৬১ কিমি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতন শিল্প, সাহিত্য ও শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। এখানকার পরিবেশে মিশে আছে শান্তি ও সৃজনশীলতার ছোঁয়া।
- সময় লাগে: ৩-৪ ঘণ্টা
- সেরা সময়: নভেম্বর থেকে মার্চ
- রুট: কলকাতা – ডানকুনি – গুসকরা – শান্তিনিকেতন
- দর্শনীয় স্থান:
- বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়: শিল্প-সংস্কৃতি ও শিক্ষার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাস।
- কলা ভবন: এখানে দেশ-বিদেশের শিল্পকর্মের দুর্লভ সংগ্রহশালা রয়েছে।
- ঠাকুরবাড়ি (আশ্রম): কবির ব্যবহৃত সামগ্রী, পাণ্ডুলিপি ও ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত।
পড়ে দেখুন: অ্যাডভেঞ্চার যারা ভালবাসেন তাদের জন্য সেরা 12 টি ট্রেকিং রুট
৬. মন্দারমণি | দূরত্ব: ১৭২ কিমি

সূর্য, সাগর ও সোনালী বালির মনোরম পরিবেশে মন্দারমণি হল এক আদর্শ সমুদ্রতট গন্তব্য। এখানে আপনি জলক্রীড়া, বিলাসবহুল রিসর্ট, আর সি-বিচের অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।
- সময় লাগে: ৪-৫ ঘণ্টা
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি
- রুট: কলকাতা – কোলাঘাট – তমলুক – কাঁথি – মন্দারমণি
- দর্শনীয় স্থান:
- মন্দারমণি সমুদ্রতট: জেট স্কি বা প্যারাসেইলিং-এর মতো জলক্রীড়ার পাশাপাশি আরামদায়ক সময় কাটানোর জন্য আদর্শ।
- তাজপুর সমুদ্রতট: নিরিবিলি পরিবেশে হাঁটাহাঁটি আর সানসেট উপভোগ করতে পারেন।
- মোহনা নদী: নৌকা ভ্রমণ, মাছ ধরা ও পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য এই নদীর মোহনা আদর্শ স্থান।
৭. দীঘা | দূরত্ব: ১৮৩ কিমি

কলকাতা থেকে উইকেন্ড গেটওয়ে হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য দীঘা। সাগরের ধারে বালুকাবেলা, স্নিগ্ধ বাতাস আর আরামদায়ক পরিবেশে বিশ্রামের জন্য দারুণ উপযুক্ত।
- সময় লাগে: ৫-৬ ঘণ্টা
- সেরা সময়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি
- রুট: কলকাতা – কোলাঘাট – তমলুক – কাঁথি – দীঘা
- দর্শনীয় স্থান:
- দীঘা সমুদ্রতট: সাঁতার কাটা, সূর্যস্নান অথবা লম্বা হাঁটা উপভোগ করুন।
- মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম: নানান সামুদ্রিক প্রাণীর সংগ্রহশালা, শিশুদের জন্য আকর্ষণীয়।
- চাঁদনেশ্বর মন্দির: ধর্মীয় পরিবেশ ও ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি উপলব্ধির জন্য দর্শনীয় স্থান।
৮. মুকুটমণিপুর | দূরত্ব: ২২৪ কিমি

জঙ্গল ও পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত মুকুটমণিপুর এক শান্তিপূর্ণ রিট্রিট। কংসাবতী নদীর বাঁধ, বিস্তৃত জলাধার ও সবুজ অরণ্যের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারবেন আপনি।
- সময় লাগে: ৫-৬ ঘণ্টা
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ
- রুট: কলকাতা – কোলাঘাট – ডেবরা – রায়পুর – মুকুটমণিপুর
- দর্শনীয় স্থান:
- মুকুটমণিপুর বাঁধ: নৌকা ভ্রমণ, সূর্যাস্ত দেখা ও প্রকৃতির নিস্তব্ধতা অনুভব করতে পারেন।
- কংসাবতী বাঁধ: হাঁটাহাঁটি ও মাছ ধরার জন্য মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
- অমরকানন বনাঞ্চল: ট্রেকিং ও ক্যাম্পিং করার জন্য আদর্শ, বিশেষ করে রাতে তারাভরা আকাশের নিচে।
৯. অযোধ্যা পাহাড়, পুরুলিয়া | ২৮৪ কিমি

হ্রদ, বাঁধ এবং জঙ্গলের জন্য পরিচিত পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের জঙ্গলে বন্যপ্রাণী অভিযানে যাত্রা করুন। ঘন বন, সুন্দর বাঁধ, জলপ্রপাত এবং সুন্দর স্থানীয় মানুষ দ্বারা চিহ্নিত এই অঞ্চলের সবুজ প্রান্তর অন্বেষণ করুন।
- সময় লাগে: ৫-৭ ঘণ্টা
- সেরা সময়: সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ
- রুট: কলকাতা-খড়গপুর-বাহারাগোড়া-বান্দুয়ান-অযোধ্যা পাহাড়ের চূড়া, অথবা কলকাতা-এনএইচ১৯-দুর্গাপুর-রঘুনাথপুর-পুরুলিয়া, এবং ঝাড়গ্রাম-বেলপাহাড়ি-অযোধ্যা পাহাড়ের চূড়া হয়ে একটি মনোরম বিকল্প
- দর্শনীয় স্থান:
- গড়পঞ্চকোট: পঞ্চকোট প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ একটি নীরব সাক্ষ্য। পঞ্চকোট পাহাড়টি প্রাণিবিদ্যার ভান্ডারে সমৃদ্ধ।
- জয়চণ্ডী পাহাড়: পুরুলিয়া-বরাকর রোডের ধারে অবস্থিত জয়চন্ডী পাহাড় একটি পর্যটন কেন্দ্র এবং পর্বতারোহণ শিক্ষাকেন্দ্র।
- বাঁধ ও জলপ্রপাত: মুরগুমা হ্রদ, বামনি জলপ্রপাত, তুরগা বাঁধ এবং মাথা বন।
১০. দার্জিলিং | দূরত্ব: ৬১৮ কিমি

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত দার্জিলিং এক অপূর্ব হিল স্টেশন। চা বাগান, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, আর মেঘে ঢাকা পাহাড় একে অনন্য করে তোলে।
- সময় লাগে: ১৪-১৫ ঘণ্টা
- সেরা সময়: এপ্রিল থেকে জুন
- রুট: কলকাতা – বহরমপুর – মালদা – কিশনগঞ্জ – দার্জিলিং
- দর্শনীয় স্থান:
- টাইগার হিল: সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া ও রঙিন আকাশ দেখতে এখানে ভিড় জমে।
- দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে: টয় ট্রেন চড়ে চা বাগান ও পাহাড়ি গ্রাম দেখার এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
- বাতাসিয়া লুপ: দার্জিলিং শহরের অপরূপ দৃশ্য দেখার জন্য আদর্শ স্থান।
আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনা করার জন্য টিপস:
- বাইকের অবস্থা: যাত্রা শুরু করার আগে নিশ্চিত করুন যে আপনার বাইকটি চমৎকার অবস্থায় আছে।
- ভাড়া: যদি আপনার কাছে বাইক না থাকে, তাহলে একটি ভাড়া নেওয়ার কথা বিবেচনা করুন।
- রুট পরিকল্পনা: কম যানজটযুক্ত রাস্তায় সর্বোত্তম রুট খুঁজে পেতে গুগল ম্যাপ বাইক বৈশিষ্ট্যের মতো সরঞ্জামগুলি ব্যবহার করুন।
- প্রস্তুতি: প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্যাক করুন এবং জরুরি অবস্থার জন্য বাফার বিবেচনা করুন।
উপসংহার
কলকাতা থেকে বাইকে রওনা দিলে আপনি শুধু ভ্রমণ নয়, বরং এক অভিজ্ঞতার যাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য কিংবা ইতিহাস — এই গন্তব্যগুলি সকল রাইডারের জন্য নানা রকম আনন্দ, শান্তি ও রোমাঞ্চের সুযোগ এনে দেয়।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷
