২০২৬ সালে সিকিম ভ্রমণ করার আপডেটেড বাংলা গাইড — কলকাতা থেকে সিকিম কিভাবে যাবেন, পারমিট কি লাগে, সেরা সময়, ৩/৫/৭-দিনের পরিকল্পনা ও বাজেট সহ সব তথ্য।
হিমালয়ের কোলে ছোট্ট এক টুকরো স্বর্গ—সিকিম। আপনি কি ২০২৬ সালে নিজের পাহাড়-প্রেমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছেন? তাহলে সিকিম আপনার জন্য সেরা গন্তব্য। তবে ২০২৬ সালের সিকিম ভ্রমণ গত কয়েক বছরের চেয়ে বেশ আলাদা। ডিজিটাল পারমিট সিস্টেম থেকে শুরু করে নতুন রাস্তাঘাট—সব মিলিয়ে সিকিম এখন আরও বেশি পর্যটক-বান্ধব।
এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালে সিকিম ভ্রমণের খরচ, সেরা সময়, পারমিট পাওয়ার নতুন নিয়ম এবং বিভিন্ন মেয়াদের ট্যুর প্ল্যান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. কেন ২০২৬ সালে সিকিম ভ্রমণ করবেন?
সিকিম সবসময়ই সুন্দর, কিন্তু ২০২৬ সালে কিছু বিশেষ পরিবর্তন একে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে:
- ডিজিটাল পারমিট (QR-Based Permit): ২০২৬ সালের শুরু থেকেই সিকিম সরকার বিদেশি ও ভারতীয় পর্যটকদের জন্য ফিজিক্যাল পারমিটের ঝামেলা কমিয়ে কিউআর কোড ভিত্তিক অনলাইন পারমিট চালু করেছে।
- উন্নত পরিকাঠামো: ২০২৩ সালের বন্যার পর উত্তর সিকিমের রাস্তাঘাটের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। এখন অনেক দুর্গম জায়গায় যাতায়াত আরও সহজ।
- রেল সংযোগের অগ্রগতি: সেভোক-রংপো রেল প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে (টার্গেট ২০২৭), ফলে ২০২৬ সালে রংপো পর্যন্ত ট্রেন লাইন দেখার অভিজ্ঞতা হবে রোমাঞ্চকর।
আরও পড়ুন – গ্যাংটক ভ্রমণের সেরা ১৫টি দর্শনীয় স্থান
২. সিকিম ভ্রমণের সেরা সময় (Best Time to Visit)

সিকিম একেক ঋতুতে একেক রূপ ধারণ করে। আপনার পছন্দ অনুযায়ী সময় বেছে নিন:
| ঋতু | মাস | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| বসন্ত (Spring) | মার্চ – মে | রডোডেনড্রন ও অর্কিডের মেলা। আকাশ পরিষ্কার থাকে। |
| গ্রীষ্ম (Summer) | জুন – জুলাই | সমতলের গরম থেকে বাঁচতে আদর্শ। তবে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হতে পারে। |
| শরৎ (Autumn) | অক্টোবর – নভেম্বর | কাঞ্চনজঙ্ঘার সবচেয়ে পরিষ্কার ভিউ পাওয়ার সেরা সময়। |
| শীত (Winter) | ডিসেম্বর – ফেব্রুয়ারি | বরফ খেলার সেরা সময়। গুরুদোংমার ও ছাঙ্গু লেক জমে বরফ হয়ে থাকে। |
টিপস: বর্ষাকালে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ধস নামার সম্ভাবনা থাকে, তাই এই সময় এড়িয়ে চলাই ভালো।
আরও পড়ুন – উত্তর সিকিম ভ্রমনের ১৫টি দর্শনীয় স্থান
৩. ২০২৬ সালের নতুন পারমিট নিয়ম (Permit Guide)
২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় আপডেট হলো অনলাইন পারমিট।
- ভারতীয় পর্যটকদের জন্য: নাথু লা পাস এবং উত্তর সিকিমের জন্য পারমিট এখন অনলাইনে বা গ্যাংটকের ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টার থেকে QR কোডের মাধ্যমে নেওয়া যায়।
- বিদেশি ও বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য: বিদেশি পর্যটকদের জন্য ফিজিক্যাল পারমিট পুরোপুরি বন্ধ। আপনাকে সিকিম ট্যুরিজমের অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে আগেই Restricted Area Permit (RAP) এবং Protected Area Permit (PAP) সংগ্রহ করতে হবে। এটি এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং দালালের দৌরাত্ম্যমুক্ত।
৪. সিকিমকে জানুন: চারটি ভাগ

সিকিম মূলত চারটি জেলায় বিভক্ত। আপনার ভ্রমণের পরিকল্পনা সহজ করতে এই ভাগগুলো বোঝা জরুরি:
ক. পূর্ব সিকিম (East Sikkim)
এর প্রাণকেন্দ্র হলো রাজধানী গ্যাংটক। এমজি মার্গ (MG Marg) হলো এখানে আড্ডা আর শপিংয়ের সেরা জায়গা। এছাড়া আছে ছাঙ্গু লেক (Tsomgo Lake), বাবা মন্দির এবং ভারত-চীন সীমান্তের নাথু লা পাস।
খ. উত্তর সিকিম (North Sikkim)
অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের আসল গন্তব্য। লাচেন (Lachen) এবং লাচুং (Lachung) গ্রাম দুটি হলো বেস ক্যাম্প। এখান থেকেই আপনি পৌঁছাবেন ১৫,০০০ ফিট উচ্চতার গুরুদোংমার লেক এবং জিরো পয়েন্টে।
গ. পশ্চিম সিকিম (West Sikkim)
শান্তি ও প্রকৃতির জন্য সেরা। পেলিং (Pelling) হলো এখানকার প্রধান আকর্ষণ। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। স্কাইওয়াক (Skywalk) এবং রাবডেন্টসে ধ্বংসাবশেষ দেখার মতো।
ঘ. দক্ষিণ সিকিম (South Sikkim)
ধর্মীয় পর্যটন ও স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত। নামচি (Namchi)-র চারধাম এবং রাভাংলা (Ravangla)-র বুদ্ধ পার্ক পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
৫. বিভিন্ন মেয়াদের সিকিম ট্যুর প্ল্যান (Itineraries)
পরিকল্পনা ১: ৫ দিন ৪ রাত (গ্যাংটক ও পূর্ব সিকিম)
যারা অল্প সময়ের জন্য আসতে চান, তাদের জন্য এই প্ল্যানটি সেরা।
- দিন ১: এনজেপি/বাগডোগরা/পাকইয়ং এয়ারপোর্ট থেকে গ্যাংটক যাত্রা। বিকেলে এমজি মার্গে ঘোরাঘুরি।
- দিন ২: গ্যাংটক লোকাল সাইটসিয়িং (রুমটেক মনাস্ট্রি, রোপওয়ে, বনঝাকরি ফলস)।
- দিন ৩: ছাঙ্গু লেক, বাবা মন্দির এবং নাথু লা পাস ভ্রমণ। রাতে গ্যাংটক ফেরা।
- দিন ৪: গ্যাংটক থেকে রাভাংলা হয়ে নামচি চারধাম দর্শন।
- দিন ৫: কেনাকাটা সেরে ফেরার পথে রওনা।
পরিকল্পনা ২: ৭ দিন ৬ রাত (উত্তর সিকিম স্পেশাল)
এটি সিকিমের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যুর প্যাকেজ।
- দিন ১-২: গ্যাংটক পৌঁছানো ও লোকাল সাইটসিয়িং।
- দিন ৩: গ্যাংটক থেকে লাচেন যাত্রা। পথে নাগ জলপ্রপাত দর্শন।
- দিন ৪: ভোরে গুরুদোংমার লেক দর্শন করে লাচুং যাত্রা।
- দিন ৫: ইয়ামথাং ভ্যালি ও জিরো পয়েন্ট ঘুরে গ্যাংটক ফেরা।
- দিন ৬: ছাঙ্গু লেক ও নাথু লা পাস।
- দিন ৭: বিদায় সিকিম।
পরিকল্পনা ৩: ১০ দিন ৯ রাত (সম্পূর্ণ সিকিম ও অফবিট)
যদি হাতে সময় থাকে, তবে সিকিমের আসল নির্যাস নিতে এই প্ল্যানটি অনুসরণ করুন।
- দিন ১-৩: গ্যাংটক ও পূর্ব সিকিম।
- দিন ৪-৬: উত্তর সিকিমের লাচেন ও লাচুং।
- দিন ৭: গ্যাংটক থেকে পেলিং যাত্রা (পশ্চিম সিকিম)।
- দিন ৮: পেলিং স্কাইওয়াক, খেচোপালরি লেক ও কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলস।
- দিন ৯: রাভাংলা বুদ্ধ পার্ক ও নামচি চা বাগান।
- দিন ১০: প্রত্যাবর্তন।
আরও পড়ুন – সিকিমের উৎসব: মুখ্য 6টি উৎসবের সময় ও ইতিহাস
৬. ২০২৬ সালে যাতায়াত ব্যবস্থা

- আকাশপথ: বাগডোগরা (IXB) প্রধান বিমানবন্দর। তবে ২০২৬ সালে সিকিমের নিজস্ব বিমানবন্দর
পাকইয়ং (PYG) অনেক বেশি সচল হয়েছে। সরাসরি কলকাতা বা দিল্লি থেকে ফ্লাইটে আসা যায়।
- রেলপথ: শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) নেমে শেয়ার গাড়ি বা সরকারি বাসে (SNT) গ্যাংটক আসা যায়। ২০২৬ সালের দিকে সেভোক-রংপো রেললাইনের ট্রায়াল রান শুরু হওয়ার কথা, যা পর্যটকদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা হবে।
- সড়কপথ: এনজেপি থেকে গ্যাংটক যেতে সময় লাগে প্রায় ৪.৫ থেকে ৫ ঘণ্টা।
৭. খরচ কেমন হতে পারে? (Budgeting)
২০২৬ সালে সিকিম ভ্রমণে খরচের একটি সম্ভাব্য ধারণা নিচে দেওয়া হলো (প্রতি জন হিসেবে, যদি ৪-৫ জনের গ্রুপ হয়):
- বাজেট ট্যুর (হোমস্টে ও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট): ১৫,০০০ – ১৮,০০০ টাকা।
- স্ট্যান্ডার্ড ট্যুর (৩ তারা হোটেল ও প্রাইভেট ট্যাক্সি): ২৫,০০০ – ৩০,০০০ টাকা।
- লাক্সারি ট্যুর: ৪০,০০০+ টাকা।
লক্ষ্য করুন: অফ-সিজনে (বর্ষা বা কড়া শীত) খরচ ৩০% পর্যন্ত কম হতে পারে। তবে নর্থ সিকিমের প্যাকেজগুলো সবসময় কিছুটা ব্যয়বহুল।
৮. সিকিমের খাবার ও সংস্কৃতি
সিকিম ভ্রমণে গিয়ে স্থানীয় খাবার ট্রাই না করলে ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে।
- মমো ও থুকপা: সিকিমের ঐতিহ্যবাহী খাবার।
- গাইখো ও ফালে: তিব্বতি ডিশ যা গ্যাংটকের রেস্তোরাঁগুলোতে পাওয়া যায়।
- লোকাল পানীয়: ‘ছাং’ (ভাতের বিয়ার) বা সিকিমের বিখ্যাত রেড ওয়াইন ট্রাই করতে পারেন।
- উৎসব: আপনি যদি ডিসেম্বরে যান, তবে ‘লসুং’ বা সিকিমিজ নববর্ষের উৎসব উপভোগ করতে পারবেন।
৯. প্যাকিং লিস্ট: কী কী সাথে নেবেন?

- পরিচয়পত্র: ভোটার কার্ড বা পাসপোর্টের অরিজিনাল এবং অন্তত ১০টি ফটোকপি। পাসপোর্ট সাইজ ছবি (পারমিটের জন্য)।
- পোশাক: থার্মাল ইনার, ভালো জ্যাকেট, গ্লাভস এবং ওল্ড মাউন্টেন জুতো।
- ওষুধ: মোশন সিকনেস (বমির ওষুধ), মাথাব্যথা এবং উচ্চতাজনিত সমস্যার (Altitude Sickness) ওষুধ অবশ্যই রাখবেন।
১০. কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও টিপস
১. প্লাস্টিক মুক্ত সিকিম: সিকিমে প্লাস্টিকের বোতল বা ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ। পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতা করুন।
২. ধূমপান: এমজি মার্গের মতো পাবলিক প্লেসে ধূমপান করলে মোটা অংকের জরিমানা হতে পারে।
৩. উচ্চতা সতর্কতা: গুরুদোংমার লেকে যাওয়ার সময় অক্সিজেনের অভাব হতে পারে। ছোট শিশু বা হার্টের সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৪. অফবিট স্পট: গ্যাংটক ভিড় মনে হলে জুলুক (Silk Route), উত্তরে (Uttarey) বা রিনচেনপং (Rinchenpong)-এর মতো অফবিট জায়গায় থাকতে পারেন।
উপসংহার
২০২৬ সালে সিকিম ভ্রমণ আপনার জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে যদি সঠিক পরিকল্পনা থাকে। ডিজিটাল পারমিটের কল্যাণে এখন আর দালালদের পিছনে ঘুরতে হবে না, শুধু অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করে বেরিয়ে পড়ুন পাহাড়ের টানে।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷