
কেওনঝড় কিংবা ওড়িশা শুধু মন্দির আর সমুদ্রসৈকতের জন্যই নয়, বরং প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে পাহাড়ি বনভূমি, ঝরনা ও অনন্য সংস্কৃতির জন্যও সমান জনপ্রিয়। এই রাজ্যের কেওনঝড় জেলা (Keonjhar) তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত। খনিজ সম্পদে ভরপুর এই জেলায় পাহাড়, অরণ্য, ঝরনা এবং ঐতিহ্য মিশে এক অসাধারণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক কেওনঝড়ের ৬টি শ্রেষ্ঠ ভ্রমণস্থান সম্পর্কে—যেগুলো প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং রোমাঞ্চ সবকিছুর স্বাদ এনে দেবে।
১. সানাঘাগড়া জলপ্রপাত (Sanaghagara Waterfall)

পরিচয় ও সৌন্দর্য:
কেওনঝড় শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি স্থানীয় ও পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য। প্রায় ৩০ মিটার উচ্চতা থেকে গড়িয়ে আসা ঝরনার ধারা চারপাশের ঘন অরণ্য আর ছোট ছোট পাহাড়ের সাথে মিলিত হয়ে অপরূপ দৃশ্য তৈরি করে।
কিভাবে পৌঁছাবেন:
কেওনঝড় শহর থেকে গাড়ি বা অটোতে সহজেই পৌঁছানো যায়। রাস্তা ভালো হওয়ায় স্বল্প সময়ে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।
কাছাকাছি আকর্ষণ:
বড় ঘাগড়া জলপ্রপাত এখান থেকে খুব কাছেই। চাইলে একসঙ্গে দুই জায়গাই ঘুরে দেখা যায়।
সেরা সময়:
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এখানে সবচেয়ে মনোরম আবহাওয়া থাকে।
পড়ে দেখুন :- ওডিশার সেরা ১১ টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সপরিবারে দেখুন
২. বড় ঘাগড়া জলপ্রপাত (Bada Ghagara Waterfall)

প্রাকৃতিক রূপ:
সানাঘাগড়ার মতোই এই জলপ্রপাতও কেওনঝড়ের কাছাকাছি অবস্থিত। ৬০ মিটার উচ্চতা থেকে ঝরঝরে জলের ধারা নেমে আসে ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে। প্রকৃতিপ্রেমী ও ফটোগ্রাফারদের জন্য এটি আদর্শ জায়গা।
কিভাবে পৌঁছাবেন:
কেওনঝড় শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। লোকাল ট্রান্সপোর্ট বা গাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায়।
কাছাকাছি আকর্ষণ:
সানাঘাগড়া জলপ্রপাতের সাথে একদিনে ভ্রমণ করা সম্ভব।
সেরা সময়:
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সবচেয়ে বেশি ভ্রমণযোগ্য।
৩. মা তারিণী মন্দির (Ma Tarini Temple)

ধর্মীয় গুরুত্ব:
কেওনঝড়ের অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র গোপীনাথপুরে অবস্থিত এই মন্দির। মা তারিণীকে এখানে শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, ভক্তরা আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করলে দেবীর আশীর্বাদে সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়।
কিভাবে পৌঁছাবেন:
কেওনঝড় শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। রাস্তা ভালো থাকায় বাস, ট্যাক্সি বা ব্যক্তিগত গাড়িতে সহজেই যাওয়া যায়।
কাছাকাছি আকর্ষণ:
মন্দির দর্শনের পাশাপাশি আশেপাশের শান্ত পরিবেশ উপভোগ করা যায়। উৎসবের সময়ে এখানে স্থানীয় মেলা বসে, যা পর্যটকদের জন্য বড় আকর্ষণ।
সেরা সময়:
চৈত্র মাসের উৎসবকালে (মার্চ-এপ্রিল) এখানে ভক্তদের ঢল নামে। তবে ভিড় এড়াতে চাইলে শীতকালে যাওয়াই ভালো।
পড়ে দেখুন – ওড়িশায় একক ভ্রমণের আদর্শ গন্তব্য : চন্দকা ও সাতকোশিয়া
৪. খণ্ডাধার জলপ্রপাত (Khandadhar Waterfall)

পরিচয় ও ইতিহাস:
ওড়িশার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জলপ্রপাত এটি, যার উচ্চতা প্রায় ২৪৪ মিটার। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সাদা পানির ধারা যেন আকাশ থেকে নেমে আসছে। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, ঝরনার আকার তলোয়ারের ধারাল দিকের মতো হওয়ায় এর নামকরণ হয়েছে “খণ্ডাধার”।
কিভাবে পৌঁছাবেন:
কেওনঝড় শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ব্যক্তিগত গাড়ি বা ভাড়া করা ক্যাব সবচেয়ে ভালো অপশন। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এখানে যাওয়ার পথে ট্রেকিং করার সুযোগও রয়েছে।
কাছাকাছি আকর্ষণ:
যদি সময় থাকে, কাছাকাছি গ্রামগুলিতে গিয়ে স্থানীয় উপজাতি সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারেন।
সেরা সময়:
বর্ষা শেষে (আগস্ট থেকে অক্টোবর) জলপ্রপাত সর্বোচ্চ রূপে দেখা যায়। শীতকালেও ঘোরার জন্য আরামদায়ক সময়।
৫. কঞ্জহারি বাঁধ (Kanjhari Dam)

আকর্ষণ:
এই বাঁধ মূলত একটি জলাধার, তবে তার চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এটিকে জনপ্রিয় ভ্রমণস্থলে পরিণত করেছে। বিশেষত সূর্যাস্তের সময় জলরাশির উপর আভা ফেলা দৃশ্য মন কেড়ে নেয়। স্থানীয়রা এখানে পিকনিক করতে আসেন।
কিভাবে পৌঁছাবেন:
কেওনঝড় শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। রাস্তা ভালো এবং সহজে পৌঁছানো যায়।
কাছাকাছি আকর্ষণ:
ভ্রমণ শেষে বাঁধের চারপাশে শান্ত পরিবেশে সময় কাটানো যায়।
সেরা সময়:
শীতকাল বা বসন্তে এখানে ঘোরা সবচেয়ে উপভোগ্য।
৬. কঞ্জিপানি ঘাঁটি (Kanjipani Ghati)

রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা:
যারা পাহাড়ি রাস্তা ধরে ড্রাইভ করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি এক দারুণ অভিজ্ঞতা। আঁকাবাঁকা রাস্তা, ঘন জঙ্গল, পাহাড় আর কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ড্রাইভ করা সত্যিই রোমাঞ্চকর। শীতে বা বর্ষায় এখানকার সৌন্দর্য ভ্রমণকারীদের মন ভরিয়ে দেয়।
কিভাবে পৌঁছাবেন:
কেওনঝড় শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ব্যক্তিগত গাড়ি সবচেয়ে ভালো অপশন, তবে অভিজ্ঞ ড্রাইভার থাকা দরকার।
কাছাকাছি আকর্ষণ:
প্রকৃতি উপভোগের পাশাপাশি এখানে প্রচুর ফটোগ্রাফির সুযোগ রয়েছে।
সেরা সময়:
জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় কঞ্জিপানি ঘাঁটির জন্য আদর্শ।
কিভাবে কেওনঝড় পৌঁছাবেন? (How to Reach Keonjhar)
- রেলপথে: কেওনঝড় নিজস্ব রেলস্টেশন দ্বারা সংযুক্ত। ভুবনেশ্বর, কলকাতা এবং ওড়িশার অন্যান্য বড় শহর থেকে সরাসরি ট্রেন পরিষেবা পাওয়া যায়।
- সড়কপথে: ভুবনেশ্বর থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূরে কেওনঝড়। জাতীয় সড়ক (NH 49) ও রাজ্য সড়ক দিয়ে বাস ও ক্যাব সহজেই পাওয়া যায়। কলকাতা থেকেও সরাসরি বাস ও ক্যাব ভাড়া করা যায়।
- বিমানপথে: সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর ভুবনেশ্বরের বিজু পট্টনায়ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Biju Patnaik International Airport)। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি বা বাসে প্রায় ৫ ঘণ্টায় কেওনঝড় পৌঁছানো যায়।
কোথায় থাকবেন? (Where to Stay in Keonjhar)
কেওনঝড়ে বিভিন্ন বাজেটের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে—সরকারি অতিথিশালা, হোটেল থেকে শুরু করে প্রাইভেট লজ পর্যন্ত।
- বাজেট হোটেল: শহরে ছোট হোটেল ও লজ পাওয়া যায়, যা স্বল্প খরচে পর্যটকদের জন্য উপযুক্ত।
- মিড-রেঞ্জ হোটেল: পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করলে শহরের ২-৩ তারকা মানের হোটেল ভালো অপশন। এদের বেশিরভাগই শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত।
- সরকারি ট্যুরিস্ট বাংলো: ওড়িশা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের (OTDC) অতিথিশালায় থাকার সুযোগ আছে, যেখানে ভালো খাবার ও মৌলিক পরিষেবা মেলে।
- প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চাইলে: ঝরনা বা পাহাড়ের কাছে কিছু ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার রয়েছে, যেখানে অগ্রিম বুকিং করলে থাকা যায়।
উপসংহার
কেওনঝড় এমন এক জেলা যেখানে প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য, ঝরনার গর্জন, পাহাড়ি রোমাঞ্চ এবং ধর্মীয় অনুভূতি—সব একসাথে পাওয়া যায়। সানাঘাগড়া ও বড়া ঘাগড়া ঝরনার শান্ত পরিবেশ, খাণ্ডাধারের মহিমা, মা তারিণী মন্দিরের আধ্যাত্মিকতা, কঞ্জহারি বাঁধের নির্জন সৌন্দর্য এবং কঞ্জিপানি ঘাঁটির রোমাঞ্চ—সব মিলিয়ে কেওনঝড় ভ্রমণ ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
কেওনঝড় ভ্রমণ প্রকৃতিপ্রেমী, ভক্ত এবং রোমাঞ্চপ্রেমী—সবার কাছেই সমান আকর্ষণীয়। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুন্দর থাকার সুযোগ এবং অসংখ্য দর্শনীয় স্থান এই জেলাকে ওড়িশার অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্যে পরিণত করেছে। তাই ওড়িশা ভ্রমণে বেরোলে কেওনঝড়কে ভ্রমণ তালিকায় রাখতে একেবারেই ভুলবেন না।

প্রতীক দত্তগুপ্ত, থাকেন কলকাতায়, কাজ বাদে বেড়ানোই যার প্রথম ভালবাসা। এই কয়েক বছর হল বেড়ানোর সাথে কলমও ধরেছেন । তিনি শুধুমাত্র যে জায়গাগুলি পরিদর্শন করেছেন সেগুলি সম্পর্কেই ব্লগ করেন না, তবে তিনি তার অনুগামীদের জন্য টিপস, কৌশল এবং নির্দেশিকাগুলি সম্পর্কেও পোস্ট করেন৷